রাত ০৩:২০, বুধবার, ১৮ মে, ২০২২, ৪ জ্যৈষ্ঠ

জাহাঙ্গীর আব্বাস আম্বীয়াদের আদর্শই নড়বড়ে

গাজীপুরের জাহাঙ্গীর আলম, রাজশাহীর আব্বাস আলী ও বগুড়ার আহসান হাবিব আম্বীয়া- তিনজনই রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নেন আওয়ামী লীগের জার্সি পরে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এখন বিপুল অর্থসম্পদের মালিকও। 

গাজীপুরের জাহাঙ্গীর আলম, রাজশাহীর আব্বাস আলী ও বগুড়ার আহসান হাবিব আম্বীয়া- তিনজনই রাজনীতির মাঠে জায়গা করে নেন আওয়ামী লীগের জার্সি পরে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এখন বিপুল অর্থসম্পদের মালিকও। কিন্তু আওয়ামী লীগের আদর্শ কিংবা দলের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ তারা দিতে পারেননি। বরং বিতর্কিত ব্যক্তি কিংবা স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগে খেসারতও দিতে হচ্ছে তাদের।

এই তিন নেতার মধ্যে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ- তার উত্থান ঘটেছিল বিএনপি নেতার ‘আশীর্বাদ’ নিয়ে। বিএনপি নেতাকর্মীদের অবৈধ সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও আছে তার নামে। রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেতাদের ভাষায়- কাটাখালীর পৌর মেয়র আব্বাস আলী ‘একজন অনুপ্রবেশকারী’। অন্যদিকে স্বার্থের খাতিরে দলের সঙ্গে ‘বেইমানি’ করার অভিযোগ আছে আম্বীয়ার বিরুদ্ধে।

জাহাঙ্গীর আলম

আওয়ামী লীগ থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার হওয়া জাহাঙ্গীর আলমের রাজনৈতিক উত্থানে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর নাম শোনা যায়। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদ পাওয়ার পরও জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতার অভিযোগও আছে জাহাঙ্গীর আলমের।

গাজীপুরের রাজনৈতিক নেতা ও গণমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাবার আর্থিক অনটনের কারণে মামা শামসুল আলমের কাছ থেকে লেখাপড়া করতেন জাহাঙ্গীর। মামা শামসুল আলম ছিলেন বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর ইসলামপুরস্থ বাগানবাড়ির তত্ত্বাবধায়ক। সেই সুবাদে গাজীপুরে শিল্পপতিদের জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে শামসুল আলম বিপুল টাকার মালিক হন। পরে জাহাঙ্গীরও মামার পথে হাঁটা শুরু করেন। এর পর ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজে পড়ার সময় ঝুট ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, জাহাঙ্গীর আলম বিএনপি নেতাদের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছে। পরে মেয়র হয়ে বিএনপি নেতাদের কাছে রেখেছেন। সিটি করপোরেশনের সব পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করেছে গাজীপুর মহানগর যুবদল নেতা রফিকুল আজিজ প্রিন্সের ছোট ভাই মার্সেল। সিটি করপোরেশনের শতকোটি টাকার টেন্ডার পেয়েছেন কালীগঞ্জ থানা যুবদল নেতা মিঠু।

জাহাঙ্গীরের রাজনৈতিক জীবনে ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন তার বন্ধু মনিরুল ইসলাম মনির। মনির জয়দেবপুর বাজারে একটি চশমার দোকানে সেলসম্যান ছিলেন। তার পৈতৃক নিবাস কোটালীপাড়ার কুশলা ইউনিয়নে। তার পরিবার বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত।

একাত্তরে হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রমের মেজ ভাই শামসুল হক জানান, মনিরুল ইসলামের বাবা শেখ আজিজ ১৯৬৯ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এবং মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করেন। ওই সময় তিনি কুশলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধু নিজে শেখ আজিজকে দল থেকে বহিষ্কার করেন। শামসুল হক বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘মনিরের মতো আওয়ামী লীগবিরোধী পরিবারের সন্তান কীভাবে গাজীপুর মেয়রের ঘনিষ্ঠ হয়!’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মনিরুল ইসলামের হাত দিয়েই সিটি করপোরেশনের সব ঠিকাদারি কাজ বণ্টন করতেন মেয়র জাহাঙ্গীর। অভিযোগ রয়েছে- প্রকৌশলী দেলোয়ার হত্যা মামলায় মনির ছিলেন মূল হোতা। তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন জাহাঙ্গীর।

গত সেপ্টেম্বরে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন জাহাঙ্গীর আলম। তার ওই মন্তব্যের অডিও-ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। এ ঘটনার পর দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয় তাকে। এর পর মেয়র পদও হারান তিনি।

আব্বাস আলী

রাজশাহীর আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপন নিয়ে আপত্তি তোলা কাটাখালী পৌর মেয়র আব্বাস আলী দলে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে নৌকা প্রতীক পেয়েছিলেন। বিতর্কিত এই মেয়রের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে খোদ জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের ভূমিকাই মুখ্য ছিল বলেও মনে করেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালের পর আব্বাস যুবলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এর তিন বছরের মাথায় তিনি মহানগর যুবলীগের সহসভাপতি পদ পান। এর পর থেকে তিনি ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বিরোধে। এর জেরে ২০০৭ সালে তিনি যুবলীগের সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কৃত হন।

২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মেরাজউদ্দিন মোল্লা। আব্বাস তার সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করেন এবং কাটাখালী এলাকায় নিজের আধিপত্য পাকাপোক্ত করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। ২০১৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান আয়েন উদ্দিন। তখন মেরাজ উদ্দিন মোল্লা হন বিদ্রোহী প্রার্থী। নৌকার প্রার্থী আয়েন উদ্দিনের বিপক্ষে মাঠে ছিলেন আব্বাস ও তার সমর্থকরা। নির্বাচনে আয়েন উদ্দিন বিজয়ী হলে আব্বাস আবার অবস্থান পাল্টান। এমপি আয়েনও তাকে কাছে টানেন নিজের আধিপত্য বাড়ানোর আশায়।

পৌরসভা ভবনে গত শুক্রবার প্রতিবাদসভায় কাউন্সিলররা মেয়র আব্বাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘রাজস্ব আদায় বাবদ পৌরসভার ফান্ডে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা ছিল। অথচ এখন চা খাওয়ার টাকাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’

কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোত্তালেব বলেন, ‘৯০ সালের দিকে তিনি (আব্বাস) জাতীয়তাবাদী তরুণ দল করতেন। তার পর তিনি জাতীয় পার্টি করতেন। গোপনে গোপনে জামায়াতের সঙ্গে তার আঁতাত ছিল।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, ‘আমরা জানি, আব্বাসের পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার এক ভাই রাবি শিক্ষক হত্যা মামলার আসামি। তার ভাই যুবদল করে। আমাদের বুঝতে দেরি হয়েছে, তিনি একজন অনুপ্রবেশকারী।’

জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। ওই সময় কে বা কারা তাকে দলে ঢোকাল, কার সুপারিশে আব্বাস নৌকার মনোনয়ন পেল- এটি আমারও প্রশ্ন।’

সংসদ সদস্য আয়েন সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমরা তো অনেক সময় বুঝতে পারি না। যদি বুঝতেই পারতাম, তা হলে জাতির পিতাকে হারাতাম না। খন্দকার মোশতাকের অনুসারীরা অনেক সময় অনেক ঘটনা ঘটায়। সেটি শুধু দলের নয়, দেশের জন্য অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখজনক ঘটনা।’

এসব বিষয়ে মেয়র আব্বাসের বক্তব্য হলো- ‘অনুপ্রবেশকারী নয়, আমি শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছি। এখন আমাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে।’

আহসান হাবিব আম্বীয়া

বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীকে কটূক্তি করা বগুড়ার শেরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বীয়া কয়েক দিন আগে নিজেই দলীয় পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

স্থানীয় অনেক নেতার ভাষ্য- আহসান হাবিব আম্বীয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেও তার বড় ভাই পিয়ার উদ্দিন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। এবারের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে পিয়ার উদ্দিন খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন। এই বিজয়ের পেছনে দলীয়ভাবে আহসান হাবিব আম্বীয়ার হাত রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৭৬ সালে আম্বীয়া ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। এর পর আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা অবস্থায় ১৯৮৮ সালে খানপুর ইউনিয়নের পর পর তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি।

আহসান হাবিব আম্বীয়ার অনুসারীরা জানান, শেরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। একপক্ষের নেতৃত্বে আছেন মজিবর রহমান মজনু। আরেক পক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ হাবিবর রহমান। আহসান হাবিব আম্বীয়া প্রথম দিকে মজিবর রহমান মজনুর পক্ষে ছিলেন। এখন আছেন এমপির সঙ্গে।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বীয়া নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘কম্পিউটারের মাধ্যমে আমার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছে। আমি যা বলেছি, তা উল্টোভাবে প্রচার করা হচ্ছে। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন এসব করছেন। তাদের মিথ্যাচার মোকাবিলা করতে না পেরে নিজেই পদত্যাগ করেছি।’

সূত্র :দৈনিক আমাদের সময়।

Share This Article


১০০ টাকা ছাড়িয়েছে খোলা বাজারে ডলারের দাম

আবারো বাড়লো স্বর্ণের দাম

বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের ত্রিদেশীয় সিরিজ

নর্থ সাউথের ১০টি বিলাসবহুল গাড়ি বিক্রির নির্দেশ

পল্লবীর মৃত্যু: অভিনেত্রীর প্রেমিক গ্রেপ্তার

প্লাস্টিক সার্জারি করাতে গিয়ে ২১ বছর বয়সী অভিনেত্রীর মৃত্যু

বড়বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে গণধর্ষণের শিকার তরুণী

আমাকে হানিমুনে গিয়েই মেরে ফেলতে চেয়েছিল :

করোনা নিয়ন্ত্রণে এবার সেনা নামাল উত্তর কোরিয়া

‘যুদ্ধ বন্ধের’ পথ বন্ধ হয়ে গেছে: রাশিয়া

হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস

দাপুটে শেষ টাইগারদের!

পি কে হালদারকে হস্তান্তরে সময় লাগবে : দোরাইস্বামী

পদ্মা সেতুর চূড়ান্ত টোল নির্ধারণ

আরও ১০ দিনের রিমান্ডে পি কে হালদার