Templates by BIGtheme NET
৪ বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ১৭ এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৪ রমজান, ১৪৪২ হিজরি
Home » Uncategorized » কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ

কাপ্তাই হ্রদের বুকে শায়িত বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আবদুর রউফ

প্রকাশের সময়: মার্চ ২৩, ২০২১, ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ

রাঙামাটির নানিয়ারচরের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কাপ্তাই হ্রদ। তার ভেতরে ছোট বড় অসংখ্য দ্বীপচর। এই নানিয়ারচরের একটি ইউনিয়নের নাম বুড়িঘাট। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর মহালছড়িতে ঘাঁটি গাড়ে মুক্তিবাহিনী।

এ কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যাতে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা করতে না পারে সেজন্য তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-মহালছড়ি পানিপথ প্রতিরোধ করার জন্য এই বুড়িঘাটে একটি চৌকি স্থাপন করে মুক্তিবাহিনী।

২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সৈন্যের সঙ্গে ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফও ছুটে আসেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। এই বুড়িঘাটের চৌকিতে ন্যস্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি।

১৯৭১ সাল ২০ এপ্রিল। মহালছড়িসহ মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প হামলার উদ্দেশ্যে কাপ্তাই লেকের পানিপথ দিয়ে ঢুকে পড়ে পাক হানাদার বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানিরও বেশি সৈন্য। ৬টি তিন ইঞ্চি মর্টার ও অন্যান্য ভারী অস্ত্রসহ তিনটি লঞ্চ ও দুটি স্পিড বোট নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের এলাকায় ঢুকে তাদের অবস্থানকে চতুর্দিকে ঘিরে ফেলে।

মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর হানাদার বাহিনীর আচমকা মর্টার শেল ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র দিয়ে গোলাবর্ষণে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। তবে প্রতিরক্ষা ব্যূহতে দায়িত্বরত ল্যান্সনায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ শত্রুপক্ষের প্রবল গোলাবর্ষণের মুখেও ছিলেন অবিচল। তিনি তাঁর অবস্থানে থেকে মেশিনগান দিয়ে শত্রুর ওপর গোলাবর্ষণ অব্যাহত রাখেন এবং সহযোদ্ধা সব সদস্যকে নিরাপদে পশ্চাদপসারণে যাওয়ার নির্দেশ দেন।’

তার সহযোদ্ধারা যখন প্রাণ বাঁচাতে পিছু হটছিলেন তখন মুন্সী আব্দুর রউফ তার পরিখা থেকে বেরিয়ে মেশিনগান দিয়ে অনবরত গুলি ছুড়তে থাকেন সরাসরি শত্রুর স্পিডবোটগুলোকে লক্ষ্য করে। তার গুলির আঘাতে শত্রুপক্ষের দুটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট পানিতে ডুবে যায় এবং দুই প্লাটুন শত্রুসৈন্যের সলিল সমাধি হয়।

এ অবস্থা দেখে শত্রুসেনাদের বাকি একটি লঞ্চ ও একটি স্পিডবোট দ্রুত পিছিয়ে মুন্সী আব্দুর রউফের মেশিনগানের রেঞ্জের বাইরে চলে যায়। সেখান থেকে সমগ্র প্রতিরক্ষা ব্যুহ এলাকায় গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এদিকে, অবস্থান পাল্টাতে দেরি করায় তার মেশিনগানের গুলির উৎস লক্ষ্য করে হানাদার বাহিনী মর্টারের গোলা ছোড়ে। সেই গোলার আঘাতে তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় এবং তিনি শাহাদাৎ বরণ করেন।

শহীদ মুন্সি আব্দুর রউফের অসীম সাহস ও বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপের ফলে শত্রুবাহিনী মহালছড়িতে মুক্তিবাহিনীর মূল অবস্থানের দিকে অগ্রসর হতে পারেনি। তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করে কর্তব্যপরায়ণতা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। বিজয় অর্জনের পর এই মহান দেশপ্রেমিককে বীরত্ব ও দেশপ্রেমের অমর স্বীকৃতি হিসেবে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে সরকার।

পাকিস্তান হানাদারবহিনী সরে যাওয়ার পর মুন্সী আব্দুর রউফের দেহ খণ্ডগুলো কুড়িয়ে এনে এই নানিয়ারচরের বুড়িঘাট দ্বীপে তাকে সমাহিত করেন স্থানীয় দয়াল কৃষ্ণ চাকমা। তারপর থেকে পরের ২৫ বছর এই কবর আগলে রাখার কাজটি একাই করেছিলেন তিনি। এই ২৫ বছরে এই বীরশ্রেষ্ঠর কবরটি আর কেউ শনাক্তের চেষ্টা করেননি। তবে ১৯৯৬ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর)-এর উদ্যোগে দয়াল কৃষ্ণ চাকমার মাধ্যমে কবরটি আবারও চিহ্নিত হয় এবং সেই দ্বীপে নির্মিত হয় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের সমাধি সৌধ।

এরপর এর দেখভালের দায়িত্ব কেয়ারটেকার হিসেবে আবারও দেওয়া হয় দয়াল কৃষ্ণ চাকমাকে। রাঙামাটি শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তরে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নের কাপ্তাই হ্রদের চারিদিকে ঘেরা চিংড়িখাল এলাকায় অপরূপ সৌন্দর্য্যমণ্ডিত একটি ছোট ঢিলার ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের স্মৃতিসৌধটি।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ সমাধি সৌধের কেয়ার টেকার দয়াল কৃষ্ণ চাকমার ছেলে বিনয় কুমার চাকমা বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। বাবাকে দেখেছি দেশের এই বীরশ্রেষ্ঠের কবর দীর্ঘদিন দেখাশোনা করতেন। এখন তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় আমিই দেখাশোনা করি। এই সমাধি স্থলটা দেখাশোনা করতে পারাই যেন আমার মুক্তিযুদ্ধ।

প্রসঙ্গত, ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার সালামতপুর গ্রামে ১৯৪৩ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ। বাবা মেহেদী হোসেন স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করতেন। মাতার নাম মুকিদুন নেছা। তিন ভাই-বোনদের মধ্যে আব্দুর রউফ ছিলেন বড়। উপজেলার কামারখালী হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়াবস্থায় ১৯৬৩ সালের ৮ মে তৎকালীন ইপিআর বর্তমানে বিজিবিতে যোগ দেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার সৈনিক নম্বর ছিল ১৩১৮৭।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

2 × four =