Templates by BIGtheme NET
১৪ মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৮ জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ জমাদিউস সানি, ১৪৪২ হিজরি
Home » অন্য পত্রিকার খবর » সাইবার সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশকে রোল মডেল হিসেবে মনে করছে বিশ্ব

সাইবার সন্ত্রাস দমনে বাংলাদেশকে রোল মডেল হিসেবে মনে করছে বিশ্ব

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ২৯, ২০২০, ১২:৩৯ অপরাহ্ণ
সহিংস উগ্রবাদকে কীভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে সে সম্পর্কে নতুন করে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছে হোলি আর্টিজেনের হামলা ঘটনা। আর একই সঙ্গে এধরনের সমস্যা মোকাবেলায় অন্য দেশগুলোর জন্য একটি মডেল হিসাবে কাজ করতে বাংলাদেশকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

২০১৬ সালের ১ জুলাই। রাত ৮ টা ৪৫ মিনিটে রাজধানী ঢাকার হলি আর্টিজান নামক এক বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ আক্রমণ করে   পাঁচ জন বন্দুকধারী। ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ভেতরের লোকজনসহ রেস্তোরাঁটি আটক করে রাখে সন্ত্রাসীরা। ১২ ঘণ্টা পর দেখা গেল রেস্তোরাঁর ভেতরে ২২ জন মারা গেছে। আর এদের অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি।

যদিও এর আগেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে, তবু হোলি আর্টিসানের গণহত্যাকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক সন্ত্রাসী আক্রমণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

সহিংস উগ্রবাদকে কীভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে সে সম্পর্কে নতুন করে চিন্তাভাবনার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছে এই ঘটনা। আর একই সঙ্গে এধরনের সমস্যা মোকাবেলায় অন্য দেশগুলোর জন্য একটি মডেল হিসাবে কাজ করতে বাংলাদেশকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

এই অপারেশনগুলোকে সেসময় নির্মম কিন্তু কার্যকর বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল। নিজের প্রতিবেশী দেশগুলোর মতোই বাংলাদেশেও বিগত চার বছর ধরে বৃহত্তর চরমপন্থী সহিংসতা তেমন দেখা যায়নি। তবুও সাদা চোখের আড়ালে আরও একটি চিত্র আছে যা উপলব্ধি করতে সময় লাগছে। সরাসরি উগ্রবাদী সহিংস কর্মকাণ্ড না হলেও অনলাইন র‍্যাডিকালাইজেশন দেখা যাচ্ছে ব্যাপক হারে এবং ক্রমবর্ধমান হারে  এর স্বাভাবিককরণও চলছে। ইসলামী চরমপন্থী গোষ্ঠীর একটি নেটওয়ার্ক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ঘৃণ্য বক্তব্য এবং ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ৮০ শতাংশেরও বেশি লোক অনলাইনে চরমপন্থী মতবাদ ছড়ানোর জন্য গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এদের মধ্যে ৬০ শতাংশই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষিত।

অনলাইনে গুজব এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে চরমপন্থাকে আবারও নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এই প্রবাহ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, অন্তত এর পক্ষে উদ্বেগজনক লক্ষণগুলো তাই বলছে। নভেম্বরের গোড়ার দিকে ফ্রান্সের সমর্থনে এবং সামাজিক মিডিয়ায় ইসলামকে অপমান করার অভিযোগে বাংলাদেশি হিন্দুদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এর আগের মাসে লালমনিরহাটে কুরআন অবমাননার অভিযোগে এক গ্রন্থাগারিককে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালের প্রথম নয় মাসে হামলা, পুলিশি অভিযান এবং গ্রেপ্তারের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি।

ডিজিটাল র‍্যাডিক্যালাইজেশন নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টা বাংলাদেশে এখন আর নতুন কিছু নয়।  হোলি আর্টিজান হামলায় জড়িত কয়েকজন যুবক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ সক্রিয় ছিলেন। এমনকি এই অভিযানের আগে  সক্রিয়ভাবে উগ্রবাদী বিষয়বস্তু প্রচার করেছিলেন তারা।

দেশের বাইরে অবস্থানকারী বাংলাদেশিদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাদের। হোলি আর্টিজান হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তাদের সহযোগিতা করেছিল কানাডায় বসবাসকারী একজন সদস্য। এই হামলায় জড়িত তাদের আরও একজন সহকারী উগ্রবাদী মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বার্তার মাধ্যমে। আল কায়েদার নেতা আনোয়ার আল-আওলকি, এবং আল কায়েদার সাথে যুক্ত বাংলাদেশী প্রচারক জসীমউদ্দীন রুমানি, যে পরবর্তীতে আইএস এর সদস্য হয়, এদের নির্মিত ভিডিও দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিল সে।

বাংলাদেশি সাইবার স্পেসে চরমপন্থী বিষয়বস্তু এখন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং এর অধিকাংশই এমনভাবে সাজানো হয়, বক্তব্যগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে করে সরকার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সনাক্তকরণ এড়ানো যায়। উদাহরণ হিসেবে ইউটিউবে জসিমউদ্দিন রহমানির ভিডিওগুলোর কথা বলা যায়, যেগুলোর ভিউ প্রতিদিন বাড়ছেই। আনোয়ার আল-আওলাকীর বক্তৃতাগুলো নিয়মিতভাবে বাংলায় অনুবাদ হচ্ছে এবং টেলিগ্রাম আর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে। ইসলামিক স্টেটের মতো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেল নিয়মিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হলেও বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় প্রচার করা কন্টেন্টগুলো কিন্তু থেকে যাচ্ছে। এইসমস্ত উগ্রপন্থী প্রচারে বিশেষায়িত ওয়েবসাইট, আলোচনার ফোরাম, সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেল এবং এমনকি সত্য-যাচাইকারী সাইটও আছে যেখানে প্রচারকারীরা নিজেদের মনগড়া তথ্য যুক্ত করে উগ্রবাদিতা ছড়ায়।

সাইবারস্পেসে সহিংস উগ্রবাদী আদর্শের বিস্তারের ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে বিশ্বব্যাপী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, উদারপন্থী লেখক, ডিজিটাল প্রভাবশালী এবং সমকামী নেতাকর্মীরা উগ্রপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে (একিউআইএস) আল কায়দার সাথে যুক্ত চরমপন্থী দলগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে সামাজিক রক্ষণশীল ইসলামের চ্যাম্পিয়ন হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। একিউআইএসের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে, যদিও এর অনুসারীরা সাধারণত বাংলাদেশী নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে চলে। এর পরিবর্তে, তারা চুপিসারে তাদের শত্রুদের লক্ষ্য করে হামলা করে এবং “নাস্তিক” এবং “নিন্দাকারীদের” বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে সাধারণীকরণ করে চলেছে।

কৌশলে তৈরি ভিডিও এবং ভাইরাল কন্টেন্টগুলোর মাধ্যমে অল্প বয়স্ক শ্রোতাদের উগ্রপন্থার প্রতি আগ্রহী করে তুলছে একিউআইএস। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সহিংস উগ্রবাদী বিষয়বস্তু শেয়ার করছে একে অন্যের সঙ্গে। এইসমস্ত ভিডিওর বিষয়বস্তু হচ্ছে- সশস্ত্র জিহাদের সমর্থন, সন্ত্রাসী দলগুলোর মহিমা প্রচার, উদারপন্থী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলার আহ্বান এবং সংখ্যালঘুদের নিন্দা করা। সেকডেভ  এর গবেষণা অনুসারে, ফেসবুকে সহিংস উগ্রবাদী পেজগুলোর প্রতিটি পোস্টে অংশগ্রহণের পরিমাণ এক বছরে বেড়েছে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত। ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসে এরকম একেকটি পোস্টে সংযুক্ত হয়েছে গড়ে ৯৯ জন, সেখানে ২০২০ এই সময়ের মধ্যে যুক্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। একিউআইএসের পক্ষে সমর্থনকারী ইসলামী ব্লগারদের সংখ্যা বাড়া এর অন্যতম কারণ।

এদিকে কোভিড -১৯ মহামারির কালে সুবিধাবাদী উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো আরও বৃহত্তর দর্শকদের কাছে পৌঁছে গেছে। ২০২০ সালের গোড়ার দিকে এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে ৫০ শতাংশেরও বেশি। আরও বেশি সংখ্যক মানুষের ইন্তারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত হবার বিষয়টিকে কাজে লাগিয়েছে উগ্রবাদী দলগুলো। ২০২০ সালের মে মাসে, কোভিড -19 সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইউটিউবে একিউআইএস মাত্র সাতটি চ্যানেলের নতুন সাবস্ক্রিপশন বেড়েছে ১ লাখেরও বেশি। মহামারি মোকাবেলায় সরকারের মনোযোগ থাকায় এই সুযোগে অনলাইন র‍্যাডিকালাইজেশনের মাত্রা বেড়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এভাবে উগ্রবাদ ছড়িয়ে পরা ও অস্ত্রায়নের বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষরাও। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার অল্প সময়ের মধ্যেই, অনলাইন ও অফলাইনে সহিংস উগ্রবাদ মোকাবেলায় জাতিসংঘের সঙ্গে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। উদাহরণস্বরূপ, এই চ্যালেঞ্জের পরিধি এবং মাত্রা অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি এবং কক্সবাজার বিশ্লেষণ ও গবেষণা ইউনিটের মতো বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে দেশটি। এছাড়া  তরুণ সমাজকে এই লড়াইয়ে যুক্ত করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহায়তায় বিভিন্ন কর্মসূচিও চালু করেছে।

বাংলাদেশের সাইবারস্পেসে চরমপন্থী বিষয়বস্তু হ্রাস করতে এই প্রচেষ্টাগুলো সহায়ক হবে এমন লক্ষণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।  গত কয়েক মাসে, কোভিড-১৯ সম্পর্কিত ভুয়া ও ভুল তথ্য প্রচার হ্রাস পেয়েছে। একিউআইএসের ইউটিউব চ্যানেলে এখনও ৬ লাখেরও বেশি সাবস্ক্রাইবার থাকলেও বেশ কয়েকটি উগ্রপন্থী চ্যানেল ইতোমধ্যে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সেকডেভ এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ইসলামিক স্টেটের সাথে সম্পর্কিত ৯০ টিরও বেশি বাংলা চ্যানেল ইউটিউব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

এক্ষেত্রে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও এগিয়ে আসছে। বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর ও ভুল তথ্য যাচাই করে চিহ্নিত করতে ‘ভুল তথ্য’ ট্যাগ যুক্ত করার কথা  জানিয়েছে সংস্থাটি। ফেসবুকে কোভিড-১৯ সংক্রান্ত নানা ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করেছে সেকডেভ যার ৭০%ই সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

ইন্টারনেট আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাত্রা বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে তাল রেখে ভুয়া তথ্য সরানোর কাজটি রীতিমতো কঠিন। কেননা মুহূর্তের মধ্যে একটা থ্য ছড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু সেটা যাচাই করে সরানোর কাজটি সময়সাপেক্ষ। দীর্ঘমেয়াদে সহিংস চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার একমাত্র উপায় হল ডিজিটাল জগতের বাসিন্দাদের শিক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি। মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে  নিরাপদ সাইবার স্পেস তৈরির ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আর এজন্য সর্বস্তরে সার্বক্ষনিক আলোচনার কোন বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

20 − 6 =