Templates by BIGtheme NET
১১ কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৭ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ , ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি
Home » বিবিধ » ‘হারানো’ মসজিদে পাল্টে যাবে মুসলিমদের আগমনের ইতিহাস

‘হারানো’ মসজিদে পাল্টে যাবে মুসলিমদের আগমনের ইতিহাস

প্রকাশের সময়: অক্টোবর ২, ২০২০, ৮:১৭ অপরাহ্ণ

ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম অববাহিকাগুলোর একটি। এই অববাহিকার নিকটস্থ একটা গ্রাম লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস। দিগন্ত জোড়া ফসলের মাঠ আর মাঝেমধ্যে বেড়ে ওঠা জনবসতির চিহ্ন, তাও খুব কমই বলা চলে। এখানেই আবিষ্কৃত হয় হিজরি ৬৯ সন তথা ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত একটি মসজিদ।

এখানকারই একটি জায়গার নাম মোস্তের আড়া বা মজদের আড়া। উঁচু টিলার মতো জায়গাটির স্থানীয় ভাষায় ‘আড়া’ নামের অর্থ জঙ্গলাকীর্ণ স্থান। বন্য প্রাণী আর সাপ-বিচ্ছুর ভয়ে এখানে মানুষের আনাগোনা তেমন ছিল না। ১৯৮৩-৮৪ সালের ঘটনা। হঠাত করেই চাষাবাদের জন্য সমতল করতে মজদের আড়ায় খোঁড়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে এখানে ইটের স্তূপ চোখে পড়ে। স্থানীয়রা পুরনো কোন জমিদার বাড়ির ধ্বংসস্তূপ ভেবে আর খোঁড়াখুঁড়ি করার আগ্রহ দেখায় নি। যে যার মতো করে ইট তুলে নিয়ে নিজেদের কাজে লাগাতো। স্থানীয় আইয়ুব আলী নামের এক ব্যাক্তি যথারীতি ইট তুলে বাড়িতে ফিরে ফিরে একটি ভাঙা ইটের টুকরো পরিষ্কার করার পর দেখেন সেটি একটি প্রাচীন শিলালিপি। ৬*৬*২ আকৃতির শিলালিপির উপর স্পষ্টাক্ষরে লেখা, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ হিজরি সন ৬৯’। এর মাধ্যমে সবাই অনুমান করে এটি একটি মসজিদের হারানো ধ্বংসাবশেষ।

‘হারানো’ মসজিদে পাল্টে যাবে মুসলিমদের আগমনের ইতিহাস

রামদাস এলাকায় বর্তমানে যারা বসবাস করছেন তাদের পূর্বপুরুষেরা এই অঞ্চলে আগমন করেন প্রায় ২০০ বছর আগে। এই মজদের আড়ার পূর্ব মালিক ছিলেন পচা দালাল। ইয়াকুব আলী তার কাছ থেকে এটা কিনে নিলে উত্তরাধিকার সূত্রে মালিক হয় নবাব আলী। মসজিদ আবিষ্কারের পর তিনি জায়গাটি মসজিদের নামে দিয়ে দেন।

পরবর্তীতে এই জায়গা নিয়ে নানারকম অলৌকিক ঘটনার কথা শোনা যায়। ১৯৮৬ সালের দিকে স্থানীয়রা এখানে নামাজ আদায় করতে শুরু করেন। তা নিয়ে আছে এক অলৌকিক কাহিনী। এক রাতে আফছার আলী শুনতে পান একজন বলছেন, ‘চলো, আমরা মজদের আড়ায় নামাজ পড়ি/।’ কণ্ঠটা ঠিক তাঁর ভায়রা নওয়াব আলীর মতো। নামাজ পড়ার জন্য তিনি বেরিয়েও পড়েন। একসময় পৌঁছে যান ভায়রার বাড়ি। বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেলেও নওয়াব আলী বের না হলে তিনি ডাকাডাকি শুরু করেন এবং বলেন, ‘নামাজ পড়ার জন্য ডেকে নিয়ে এসে তুমি আর বেরোচ্ছ না কেন?’ এ কথা শুনে নওয়াব আলী অবাক হয়ে যান। ঘটনাটা এলাকায় জানাজানি হলে, সবাই মিলে ওই দিন থেকেই নামাজ পড়া শুরু করেন। এলাকাবাসীর মতে, সেটা ’৮৬ সালের মহররমের ১০ তারিখ। পরবর্তী সময়ে এখানেই নির্মাণ করা হয় হারানো মসজিদ কমপ্লেক্স এবং একটি নূরানী মাদ্রাসা। বর্তমানে এটি সাহাবা মসজিদ নামে পরিচিত।

১২০০ খৃষ্টাব্দে উপমহাদেশে মুসলিম আগমন ঘটে বলেই ইতিহাস থেকে জানা যায়। সেই অবস্থায় তারও কয়েকশ বছর আগের মসজিদ আবিষ্কার কিছুটা বিস্ময়েরই বটে। ইতিহাস এবং সভ্যতার পালাবদলে আর কত রহস্য লুকিয়ে আছে এই অঞ্চল ঘিরে তাও হয়তো একদিন জানা যাবে।

স্থানীয় অনেকের মতে এই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন আবু আক্কাছ (রা.) নামে একজন সাহাবা। যিনি এই অঞ্চল দিয়ে চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এবং চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে ঐ সাহাবার নির্মিত মসজিদ ও সমাধি রয়েছে।

ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিলের মাধ্যমে এই ব্রহ্মপুত্র তিস্তা অববাহিকা ঘিরে সভ্যতার ইতিহাসের দলিলপত্র পাওয়া যায়। রোমান ও জার্মান অনেক ইতিহাসবিদদের লেখায় আরব ও রোমান বণিকদের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় নৌ-বাণিজ্যের সূত্রে আসা-যাওয়ার কথা লিপিবদ্ধ আছে। আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব আর্কিওলজি টিম স্টিলকে জানায়, তাদের বেশ কয়েকটি চলমান গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ হিসেবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীনের ভেতর দিয়ে আরব বণিকদের বাণিজ্য বহরের যাতায়াতের অনেক প্রমাণও পাওয়া যায়। এইসব থেকে ধারণা করা হয় এতো শতক আগে এখানে এই মসজিদ নির্মাণ আশ্চর্যজনক হলেও খুবই সম্ভব।

টিম স্টিল নিজ উদ্যোগে ১৯৯৮ সাল থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস অনুসন্ধান শুরু করেন। লালমনিরহাটে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন মসজিদের খোঁজ পেয়ে এই অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার নেশা পেয়ে বসে তার। তার মতে, ওই মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস খুঁজে পেলে হয়তো বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্ব সভ্যতার সম্পর্কের আরেক ইতিহাস জানার পথ খুলে যাবে। রোমান, চৈনিক, আরব আর বাংলা—এই চার অঞ্চলের প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক জানা গেলে হয়তো পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে হবে। টিম স্টিলের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, এটি এক হাজার তিন শ চৌষট্টি বছর আগের মসজিদ যার সূত্র ধরে পাল্টে যাবে দক্ষিণ এশিয়ায় মুসলিমদের আগমনের ইতিহাস।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিকদের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব আর্কিওলজিস্ট‘ এর মতে, রোমান ও জার্মান ইতিহাসবিদদের লেখায় আরব ও রোমান বণিকদের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাকে বাণিজ্যিক পথ হিসাবে ব্যবহারের কথা লিপিবদ্ধ আছে এবং বেশ কয়েকটি চলমান গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা অববাহিকাকে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নৌপথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

চীনের বিস্মৃত কোয়াংটা নদীর ধারে কোয়াংটা শহরে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা) এর একজন সাহাবী আবু ওয়াক্কাছ (রা) নির্মিত মসজিদ ও সমাধি রয়েছে। ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক টিম স্টিল দাবি করেন, খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পাড় ধরে সিকিম হয়ে চীনের মধ্য দিয়ে আরব ও রোমান বণিকদের বাণিজ্য বহরের যাতায়াতের অনেক প্রমাণ রয়েছে তার কাছে। এই হারানো মসজিদটি হতে পারে সাহাবী আবু ওয়াক্কাছ (রা) নির্মাণ করেছেন। কারণ তিনি এই অঞ্চল দিয়েই চীনে পাড়ি জমিয়েছিলেন। রংপুুরের টাউন হলে ১৯৯৩ সালে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়, যার বিষয়বস্তু ছিল ‘হিজরি প্রথম শতাব্দীতে ইসলাম ও বাংলাদেশ’। এতে সভাপতিত্ব করেন কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল কুদ্দুস বিশ্বাস। সেদিন প্রবন্ধকার ও সব আলোচক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, ৬৯ হিজরি অর্থাৎ ৬৯১ খ্রিস্টাব্দে সাহাবায়ে কেরামগণ কর্তৃক এই হারানো মসজিদ নির্মাণ করা মোটেই অসম্ভব নয়।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে মসজিদটি ২১ ফুট চওড়া এবং ১০ ফুট লম্বা। এর চারটি স্তম্ভ ছিল যার দুটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বর্তমানে এখানে একটি মসজিদ ও নূরানি মাদ্রাসা রয়েছে। আর হারানো মসজিদের শিলালিপিটি বর্তমানে সংরক্ষিত আছে রংপুরের তাজহাট জাদুঘরে।

সুপ্রাচীন এই মসজিদটি রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়কের ১ কিলোমিটার দক্ষিণে লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের রামদাস মৌজায় অবস্থিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

6 + 5 =