Templates by BIGtheme NET
৪ কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২০ অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ , ২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪২ হিজরি
Home » জাতীয় » তিস্তা ইস্যুতে ভারতে বিরক্ত হয়ে চীনে ঝুঁকছে বাংলাদেশ !

তিস্তা ইস্যুতে ভারতে বিরক্ত হয়ে চীনে ঝুঁকছে বাংলাদেশ !

প্রকাশের সময়: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০, ৩:৩০ অপরাহ্ণ

গত এক দশক ধরে ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি করতে ব্যর্থ হওয়ার পরে চীনের সমর্থন নিচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তিস্তা বিষয়ক একটি প্রকল্পে চীনের কাছ থেকে ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ নিচ্ছে।

তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি সংরক্ষণ বিষয়ক চীনের এমন একটি প্রস্তাব এখন বিবেচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। তিস্তা হলো বাংলাদেশের চতুর্থ সর্ববৃহৎ নদী। ভারত থেকে তা বাংলাদেশে প্রবাহিত হয়েছে।

৩০ সেপ্টেম্বর সাউথ এশিয়ান আপডেটস নামের একটি অনলাইন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি চূড়ান্ত করতে প্রায় এক দশক ব্যয় করেছে বাংলাদেশ। এমন অবস্থায় চীনের কাছ থেকে এই প্রস্তাব পেল বাংলাদেশ।

২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের পরেই  ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে স্থগিত হয়ে যায়। তারপর থেকে ভারতের সঙ্গে দরকষাকষিতে আর কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি বাংলাদেশ।

এরই মধ্যে বাংলাদেশ উজানে ড্যাম নির্মাণ, সেচ ক্যানাল খনন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির স্তর ব্যাপকভাবে কমে যায়। এ অবস্থায় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের কিছুটা ভাটা ধরে।

শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করতে পারেন না। ২০১৬ সালে শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নেমে দাঁড়ায় ৩০০ কিউসেক। দুই দশক আগের চেয়ে এই পরিমাণ ২০ গুণেরও বেশি কম।

তাই চীন সমর্থিত নতুন তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ প্রকল্প বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে আশার আলো দেখাচ্ছে। এসব মানুষ বর্ষা মৌসুমে বন্যা ও নদীভাঙনের শিকারে পরিণত হন। আবার শুষ্ক মৌসুমে মারাত্মক পানি সংকটে ভোগেন।

এ প্রসঙ্গে পানিসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার চীনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, আমরা একটি প্রস্তাব  পেয়েছি। এখন একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে তাদের সঙ্গে আমাদের শর্ত ঠিক করতে আলোচনায় বসার প্রয়োজন।

উল্লেখ্য, হিমালয়ের পূর্বাঞ্চলে জন্ম নিয়ে তিস্তা প্রথমে ভারতের সিকিম রাজ্যের ভিতর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। তারপর তা বাংলাদেশে এসে মিশে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে। এরপর সম্মিলিত স্রোতধারা গিয়ে পতিত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে।

এই নদীর ৩১৫ কিলোমিটার চলার পথে ১০০ কিলোমিটারের কিছু বেশি রয়েছে বাংলাদেশে। এই চলার পথে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ তাদের জীবনজীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নির্ভর করেন তিস্তার ওপর।

‘তিস্তা রিভার কমপ্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট এন্ড রিস্টোরেশন প্রজেক্ট’ বাস্তবায়নের জন্য গত জুলাইয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৯৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার ঋণ চায় চীনের কাছে।

এতে বলা হয়, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের শতকরা ১৫ ভাগ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার। বাকিটা তারা চীনের কাছ থেকে সহায়তা হিসেবে চায়। প্রতি বছর হিমালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বহন করে তিস্তার পানি।

এর ফলে এর নেটওয়ার্কে ছোট ভোট খাল ও দ্বীপের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে ঘন ঘন বন্যা হয় এবং বর্ষাকালে নদীর পাড় ভাঙে মারাত্মকভাবে।

অন্যদিকে, বিপরীত চিত্র শুষ্ক মৌসুমে। কিন্তু সুরক্ষার অভাবে হাজার হাজার মানুষ তাদের জমিজমা, বাড়িঘর, জীবন জীবিকা হারান।

ওদিকে, এই প্রকল্পের জন্য ২০১৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বরে একটি বাধ্যতামূলক নয় এমন একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না (পাওয়ার চায়না)। পাওয়ার চায়না চীনের রাষ্ট্র মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান।

এরপর এ প্রকল্পের একটি মাস্টার প্লান ও উপযোগিতা বিষয়ক পর্যবেক্ষণ জমা দিয়েছে পাওয়ার চায়না। প্রাইমারি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজালে বলা হয়,  তিস্তা নদীর উভয় পাশে পুরো ১০০ কিলোমিটারে তীর মেরামত বা বাঁধ দেয়া হবে।

সীমান্তে ভারতের কাছে যেখানে বাংলাদেশে এই নদী প্রবেশ করেছে সেখান থেকে শুরু করে ব্রহ্মপুত্র পর্যন্ত এই বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে নদীর তীররক্ষা প্রকল্প।

গ্রোয়েন নির্মাণ করে নদীভাঙ্গন রক্ষা। তবে সবার আগে এই প্রকল্পে ড্রেজিং করা হবে এবং পুরো ১১০ কিলোমিটার তিস্তা নদীকে আরো গভীর করা হবে। এর ফলে নদীর গতিতে স্থিতিশীলতা থাকবে। সেখান থেকে পানি নিয়ে কৃষিকাজে ব্যবহার করা হবে।

নির্মাণ করা হবে খাল ও পুকুর। সেখানে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য পানি সংরক্ষণ করা হবে। ড্রেজিং করা মাটি দিয়ে হারানো জমি পুনরুদ্ধার করা হবে। নদীর পাড় ঘেঁষে নির্মাণ করা হবে সড়ক, স্যাটেলাইট শহর ও শিল্প পার্ক। এছাড়া থাকবে গার্মেন্ট প্রসেসিং কারখানা ও সার কারখানা।

বাংলাদেশ আশা করছে, এই প্রকল্প তিস্তা অববাহিকায় কৃষিকাজে ব্যাপক উন্নতি ঘটাবে।

কবির বিন আনোয়ার স্থানীয় মিডিয়ায় বলেছেন, আমরা যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে সঙ্কটের সময় বাংলাদেশের বিশাল একটি অংশ পানি পাবে।  বর্তমানে বছরে কমপক্ষে দু’মাস ভয়াবহ পানি সঙ্কটের মুখে পড়ে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল। কারণ, এ সময়ে তিস্তায় পানি থাকে সামান্য। পানি সঙ্কটের কারণে এ সময়ে বাংলাদেশে তিস্তা অববাহিকায় এক লাখ ১১ হাজার হেক্টর কৃষিজমির বেশির ভাগই থেকে যায় চাষের বাইরে।

২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এসব জমির শতকরা মাত্র ৩৫ ভাগে কৃষিকাজ করা হয়েছিল। ১৯৯৭ সালে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি ছিল প্রায় ৬৫০০ কিউসেক। তবে ২০০৬ সালে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৩৪৮ কিউসেক। ২০১৬ সালে আরো কমে তা দাঁড়ায় মাত্র ৩০০ কিউসেকে।

অন্যান্য দিকগুলোর মধ্যে এই প্রকল্পটি পরিবহন ও শিপিংয়ের উপর জোর দেবে এবং সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করবে, বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে এবং স্থানীয় আর্থ-সামাজিক বিকাশ করবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি স্থানীয় অর্থনীতির উন্নতিসহ কর্মসংস্থান বাড়াবে।

গত মাসে পাওয়ার চীন বাংলাদেশে ৫০০ মেগাওয়াট সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের বিকাশের জন্য একটি ইপিসি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা দেশের নবায়নযোগ্য ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সংযোজন।

বর্তমানে পায়রা সমুদ্রবন্দর, বরিশাল-ভোলা সেতু  ও টেকনোলজি পার্কসহ নয়টি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জন্য চীনা অর্থায়নের সন্ধান করছে বাংলাদেশ।

২০১৬ সালে চীনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় দুদেশ মধ্যে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি প্রকল্পের জন্য সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে।

তিস্তা প্রকল্পের সাথে যুক্ত হলে চীন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে যুক্ত হবে।  বাংলাদেশের সাথে ভারতের ৫৪ টি যৌথ নদী রয়েছে।

তিস্তা অঞ্চলটি কৌশলগত দিক থেকে ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেকে এই প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগকে তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে সুবিধা নেয়ার সুযোগ হিসাবে দেখছেন।

তিস্তার বিষয়টি এমন এক সময়ে আলোচিত হয়েছে যখন ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই অঞ্চলে ‘আরও ভাল’যোগাযোগ সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ও ভারতের প্রভাব সীমাবদ্ধ করার জন্য চীন ইতোমধ্যে বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশ মিডিয়াতে তিস্তা ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনা বিনিয়োগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে, নয়া দিল্লি তার পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলাকে ঢাকায় প্রেরণ করেছে।

তবে শ্রিংলা তাঁর আলোচনার সময় এই বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন কিনা তা জনসমক্ষে নিশ্চিত করা হয়নি।

তথ্যসূত্র: সাউথ এশিয়ান আপডেটস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

sixteen − five =