Templates by BIGtheme NET
২১ চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৪ এপ্রিল, ২০২০ ইং , ৯ শাবান, ১৪৪১ হিজরী
Home » আন্তর্জাতিক » শৃঙ্খলায় মুক্তি প্রমাণ করলো চীন

শৃঙ্খলায় মুক্তি প্রমাণ করলো চীন

প্রকাশের সময়: মার্চ ২৪, ২০২০, ২:০৫ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে চীন। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে এ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর বিশ্বের প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে গেছে ভাইরাসটি। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যাও। কিন্তু চীনে গত ১৯ মার্চের পর আর কোন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। মাত্র আড়াই মাসের মধ্যে করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে দেশটি।

করোনার উৎপত্তিস্থল উহান প্রদেশ আবার খুলে দেয়া হয়েছে। রীতিমত আতশবাজী ফুটিয়ে করোনা ভাইরাসকে বিদায় দিয়েছে চীন।

কোন যাদুর কাঠিতে এমন সফলতা পেল চীন?

চিকিৎসক/ বিজ্ঞানীদের দিক নির্দেশনা :

চীনের বিজ্ঞানীরা শুরুতেই সরকারকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যেভাবেই হোক মানুষেকে ঘরে আটকে রাখতে হবে। নয়তো বাঁচবে না কেউ। হোম কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, মাস্ক ব্যবহার, হাঁচিকাশি নিয়ন্ত্রণের কিছু গাইডলাইনও তারা ঠিক করে দেন। যেটির শতভাগ নিশ্চিত করে সরকার।

এছাড়া ভাইরাসটি কতটা ছড়িয়ে পড়তে পারে সে বিষয়ে তারা কিছু ধারণা দেন। সে অনুযায়ী হাসপাতাল, ডাক্তার, ওষুধপত্র ও মেডিকেল ইকুইপমেন্টের জন্য ব্যপক প্রস্তুতি নেয় সরকার।

উহান শহর :

চীনের প্রথম সফলতাটি হলো উহান শহরটিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। এ শহরের সোয়া কোটি বাসিন্দার জন্য হোম কোয়ারেন্টাইন ছিলো বাধ্যতামূলক। এ জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শহরটি লকডাউন করার ফলে যানবাহন তো দুরে থাক, পায়ে হেটেও সেখানে প্রবেশ বা বের হওয়া সম্ভব ছিলো না।

উহানের একজন ব্যক্তিও ঘর থেকে বের হতে পারবে না’ এমন নির্দেশনা জারি করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগীতায় সেখানকার ডাক্তাররা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উহান প্রদেশের প্রত্যেকটি ঘরে গিয়ে করোনা আক্রান্তদের সনাক্ত করেন। এসময় তাদের খাবারসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হয়। এর ফলে উহান শহরের বাইরে রোগটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যেতে পারেনি।

হুবেই প্রদেশ :

উহান ছিলো হুবেই প্রদেশের প্রধান শহর। হুবেই প্রদেশের ৫ কোটি বাসিন্দাকেও চীন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। তাদেরও মূলত ঘরে আটকে রাখা হয়। বিশেষ প্রয়োজনে বের হলেও মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিলো। এছাড়া সামাজিক মেলামেশা, উৎসব-অনুষ্ঠান সবই ছিলো নিষিদ্ধ।

চীন :

উহান শহর ও হুবেই প্রদেশের বাইরে সমগ্র চীনের জন্যও কিছু বিশেষও কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হয়। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়নেও সবাইকে বাধ্য করা হয়।

এর প্রথম পদক্ষেপটি হচ্ছে মুখে মাস্ক পরা। মাস্ক ছাড়া কোনো দোকান, এমনকি নিজের অ্যাপার্টমেন্টেও তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। মাস্কের বিপুল চাহিদা সামাল দেওয়ার জন্য প্রতিদিন ১৬ লাখ মাস্ক উৎপাদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ভবন ও দোকানে প্রবেশের আগে শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা করা হয়। তাপমাত্রা ৯৯.১ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে গেলেই তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে।

চিকিৎসকদের লড়াই :

মাত্র ১০ দিনের মধ্যে ২ হাজার ৩০০ শয্যার দুটি হাসপাতাল নির্মান করে দেশটি। তখন উহানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। এই হাসপাতালে চিকিৎসক ছিলেন ১ হাজার। করোনা মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার রোগিকে চিকিৎসা দিয়েছে হাসপাতালটি।

এছাড়া করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য এই প্রদেশে ৪২ হাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী পাঠানো হয়। এ সময় ৩০০ চিকিৎসাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হন যাদের মধ্যে ১৩ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

মোবাইল অ্যপ :

চীনের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যপারটি ঘটে মোবাইলে। চীন একটি অ্যপ ডেভলপ করে সেটি সবাইকে ডাউনলোড করতে নির্দেশ দেয়। সেই অ্যপের মাধমে ছবি তুললে ব্যবহারকারীর গায়ের তাপমাত্রাসহ বিভিন্ন শারীরিক অবস্থার একটি চিত্র পাওয়া যায় যা দেখে কর্তৃপক্ষ সহজেই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে যে ব্যবহারকারী করোনা আক্রান্ত কিনা বা আক্রান্তের আশঙ্কা আছে কিনা।

এ ক্ষেত্রে তিনটি রং ব্যবহার করা হয়েছে। সবুজ (সুস্থ) হলুদ (আশঙ্কা আছে) লাল (করোনা আক্রান্ত)। এই তিনটি রঙের ডেমোগ্রাফি দেখে করোনা আক্রান্ত এলাকা সহজেই চিহ্নিত করার ও ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।

এছাড়া মোবাইলের জিপিআরএস হিস্টরি ব্যবহার করে দেখা হয়েছে করোনা আক্রান্ত এলাকা থেকে কেউ সুস্থ এলাকায় ঢুকেছেন কিনা। এলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোয়ারেন্টাইনে বাধ্য করা হয়েছে।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে অনেক খাবারের দোকানে মুখোমুখি বসে খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে খুব একটা সহজ নয়।

গবেষকদের নির্ঘুম রাত :

ভাইরাসের গতিবিধির ওপর সার্বক্ষনিক নজর রাখছিলেন চীনের গবেষকরা। ভাইরাসটি যে বার বার মিউটেশন করছে সেটিও তারা বুঝতে পারছিলেন। রোগীর অবস্থা ডাক্তারদের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে জাপানি গবেষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছিলেন। জাপানের বিজ্ঞানীরা সর্বশেষ যে ওষুধটি আবিস্কার করেছেন তা গবেষনার দিন-রাত জন্য তথ্য যুগিয়েছেন চীনের বিজ্ঞানীরা।

জনগণের শৃঙ্খলাবোধ :

চীনের জনসংখ্যা বেশি হলেও তারা শৃঙ্খলা মানতে পছন্দ করেন। সরকারের তরফ থেকে যখন যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তা তারা পালন করেছেন। ডাক্তারদের পরামর্শও পালন করেছেন পুরোপুরি।

সর্বপরি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই করোনা যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে দেশটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

10 − two =