Templates by BIGtheme NET
৩০ শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৪ আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ , ২৩ জিলহজ, ১৪৪১ হিজরি
Home » জাতীয় » সাংবাদিক সেলিনা পারভীন
পাকবাহিনীর বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত এক নারী শহীদ

সাংবাদিক সেলিনা পারভীন
পাকবাহিনীর বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত এক নারী শহীদ

প্রকাশের সময়: ডিসেম্বর ১৫, ২০১৯, ৩:৪৪ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে আমাদের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এই যুদ্ধে যেসব নারী ইতিহাসের পাতায় নাম লিখেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীন। তিনি ছিলেন একজন নির্ভীক কলমসৈনিক।

বাংলাদেশকে পঙ্গু করতে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাজাকার, পাকিস্তানিরা যেসব মেধাবী সন্তানকে হত্যা করেছিল তাদেরই একজন শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিন।

জানা গেছে, ১৯৬৯ সালে স্বাধীনতার পক্ষের একটি পত্রিকা বের করেন এই সাহসী নারী সাংবাদিক। তিনি নিজেই এটির সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করেন৷ শিলালিপির বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়েই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। উদ্দেশ্য ছিল কলম দিয়ে পাকবাহিনীকে ঘায়েল করা।

তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে শিলালিপির প্রকাশিতব্য সংখ্যা নিষিদ্ধ করে দেয় পাকিস্তান সরকার৷ পরে জনতার প্রচণ্ড চাপে পাকিস্তানি সরকার অবশ্য প্রকাশের অনুমতি দিলেও পত্রিকাটিকে নতুনভাবে সাজানোর শর্ত বেধে দিয়েছিল। কিন্তু নাছোরবান্দা সেলিনা পারভীন। তিনি বরাবরের মতো তার মতো করে প্রকাশ করেছিলেন। আর এটিই কাল হলো সেলিনা পারভীনের।

জানা গেছে, নির্ভীক এই নারী কলমসৈনিক তখন বাস করতেন সিদ্ধেশ্বরীতে। সালটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর। ১১৫ নম্বর নিউ সার্কুলার রোডে তার বাসায় তখন উপস্থিত মা, ছেলে সুমন ও ভাই। শহরে তখন কারফিউ, রাস্তায় মিলিটারি।

সেদিন শীতের সকালে তাঁরা সবাই ছাদে ছিলেন। সন্তান সুমনের গায়ে তেল মাখিয়ে সেলিনা বললেন যাও বাবা এবার একটু খেল, আমি লিখব। সেলিনা লিখছিলেন, এমন সময় তার দরজায় কড়া নাড়ে কিছু লোক। তাদের মুখ রুমাল দিয়ে ঢাকা ছিল। এবং সবার পরনে ছিল একই রঙের পোশাক। তারা তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে সেলিনা পারভিনকে নিয়ে যেতে চাইলে পারভিন বলেন, বাইরে তো কারফিউ। জবাবে কোনো সমস্যা হবে না জানান ওই লোকগুলো।

ওই সময় ছেলে সুমন তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলে আমিও তোমার সঙ্গে যাব। সেলিনা পারভিন বলেন, না বাবা, তুমি মামার সঙ্গে খেয়ে নিয়ো, আমি যাব-আর আসব। এটাই ছেলের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ কথা। কোমরের গামছা দিয়ে চোখ ও হাত পিছমোড়া করে বেঁধে সেলিনা পারভীনকে নিয়ে যায় আলবদরেরা। তিনি আর ফিরে আসেননি।

১৪ ডিসেম্বর আরও অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো পাকিস্তানের দালাল আলবদর বাহিনীর ঘৃণিত নরপশুরা সেলিনা পারভীনকে হত্যা করে। তার সারা শরীরে ছিল ঘৃণিত আলবদর, নরপিশাচের নির্মম অত্যাচারের চিহ্ন। চেহারা এমন ভাবে বিকৃত করেছিল যে তাকে চেনার উপায় ছিল না। তার দেহে স্তনের একটি অংশ কাটা ছিল, লালচে দগদগে জমানো রক্তে সারা শরীর ভেজা।

নির্ভীক এই সৈনিকের চোখ বাঁধা ক্ষতবিক্ষত লাশ পড়ে ছিল রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে। শীতকাতুরে সেলিনার পায়ে তখনো পরা ছিল সাদা মোজা। এটি দেখেই তাঁকে শনাক্ত করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর তাকে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে সমাহিত করা হয়।

১৬ ডিসেম্বর লাল-সবুজ পতাকা উড়েছিল। শহীদ সেলিনা পারভিন সেই আলোয় রাঙা ভোর দেখে যেতে পারেননি। এই পতাকার লাল বৃত্তের মাঝে লাখো শহীদের রক্তের সঙ্গে তাঁর রক্তের দাগও মিশে আছে। এই স্বাধীন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভিনের বিনিময়ে। যোদ্ধারা হারায় না। তারা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে যায়। তাদের মানুষ স্মরণ করে অন্তরের অন্তস্তল থেকে। তাইতো বিজয়ের মাসে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে এই বিুদ্ধিজীবীকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

7 + nine =