Templates by BIGtheme NET
২৫ শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৯ আগস্ট, ২০২০ ইং , ১৮ জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী
Home » বিশেষ সংবাদ » ফেক নিউজ: কীভাবে লড়াই করবেন?

ফেক নিউজ: কীভাবে লড়াই করবেন?

প্রকাশের সময়: ডিসেম্বর ৪, ২০১৯, ১২:৪৪ অপরাহ্ণ

সম্প্রতি “ফেক নিউজ” শব্দটি চারদিকে শোনা যাচ্ছে। ফেক নিউজ বা গুজব নিয়ে প্রত্যেকেই উদ্বিগ্ন। সরকারী উর্ধবতন কর্মকর্তাদের জোরালোভাবে বলতে দেখি যে, “গুজব” বা ফেক নিউজ জনগণ ও দেশের স্বার্থে নির্মূল করা উচিত।

এছাড়াও সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার কর্মীরাও নিয়মিত ক্রমবর্ধমান অনলাইনে ভুল তথ্য সম্পর্কে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এটি মাঝে মাঝে সমাজের সংখ্যালঘুদের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনে। ফেক নিউজ বা গুজব সমাজ ও সরকারকে উদ্বিগ্ন করছে।

সাধারণ মানুষও এই অপকর্ম সম্পর্কে কম চিন্তিত নয়। ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কিছু লোক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে দেয় ফেক নিউজ বা গুজব। সবার মঙ্গলের জন্যই ফেক নিউজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নইলে এই ফেক নিউজ বা গুজব বাড়তেই থাকবে, বিলোপ হবে না। কিন্তু ‘‘কেন’’?

প্রায় দুই বছর ধরে ফেক নিউজ ও ভুল তথ্য নিয়ে গবেষণা করছি। দীর্ঘ গবেষণার পরে আমি এই ‘‘কেন’’ এর উত্তর বের করার চেষ্টা করেছি। নিচের তিনটি কারণে ফেক নিউজ বা গুজব ছড়িয়ে পড়ে ও সফল হয়।

এক, জনসাধারণের উদাসীনতা:

সাধারণত লোকেরা ফেক নিউজকে কুসংস্কারের মতো বিশ্বাস করে তা যতই উদ্ভট বিষয় বা মিথ্যা হোক। মূলত এখান থেকেই সমস্যা শুরু হয়। অবাধ তথ্য প্রবাহ ও সোশ্যাল মিডিয়ার এ যুগে অনলাইনে প্রাপ্ত তথ্যের উপর নির্ভর করার ক্ষেত্রে সবাইকে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে, মানুষের প্রবণতাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এলোমেলো অনলাইন উৎস থেকে কোনো তথ্য পেলেই তা সময় নিয়ে যাচাই করা উচিত। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমনটা করা হচ্ছে না।

টুইটারে মানুষের আচরণ নিয়ে আমেরিকার ম্যাসাচুয়েটস ইনস্টিটিটস অব টেকনোলজি(এমআইটি) গত বছর একটি গবেষণা শেষ করেছে। সেখানে বলা হয়, ‘মিথ্যার বিস্তার সত্যকে ছাপিয়ে যাচ্ছে, মানুষ সত্য খবরের চেয়ে মিথ্যা খবর বেশি রিটুইট করে।”

আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাক্ট-চেকার হিসাবে কাজ করে, আমি এমন অনেক ঘটনা পেয়েছি যেখানে উচ্চ শিক্ষিত লোকেরাও সামাজিক মিডিয়ায় আসা ফেক নিউজগুলোকে বিশ্বাস করেছেন। রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য কুসংস্কারগুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জনগণের মধ্যে এই উদাসীনতা ফেক নিউজকে বিকশিত করতে বড় ভূমিকা পালন করছে।

সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা গড়ে তোলা হলে এই সমস্যাটি মোকাবেলা করা সহজ হবে, তবে বাংলাদেশী সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থায় সমালোচনা চিন্তাভাবনার চর্চা একেবারেই হয় না। শিক্ষার্থীদের বাড়ীতে ও শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার পরিবেশ না থাকায় কখনও কখনও অস্বাভাবিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করাকে আপত্তিজনক বলে মনে করা হয়।

দুই, মিডিয়ার উদাসীনতা:

ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য মূলধারার মিডিয়া বর্তমান তৎপরতার জন্য আংশিক দায়ী। একাধিক গবেষণায় দেখা যায়, মূলধারার মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পক্ষপাতিত্বমূলক ভূমিকা পালন করে থাকে। এর ফলে ক্রমাগত বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে।

সম্প্রতি গ্যালাপের এক জরিপে বলা হয়েছে, “আমেরিকানরা গণমাধ্যমকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিশ্বাস করেন না। কারণ বর্তমানে আমেরিকায় ৪১ শতাংশ পত্রিকা, টেলিভিশন ও রেডিও ‘পুরোপুরি নির্ভুল ও নিখুঁতভাবে’ প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রচার করে। মূলধারার ৪১ ভাগ মিডিয়ায় উপর আমেরিকারা ‘ আস্থা রাখে’’।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা সম্পর্কে কোনো তথ্য না থাকায় এ বিষয়ে বিষদভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে যদি কেউ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্রমবর্ধমান সংকোচনের বিষয়টি বিবেচনা করে নেয় তবে বলা যেতে পারে যে পরিস্থিতি এখানে আরও খারাপ।

ধীরে ধীরে মূলধারার মিডিয়াগুলোর উপর আস্থা হারিয়ে মানুষজন বিকল্প মাধ্যমের সন্ধান করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়া তার বিকল্প হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। জনসাধারণের মধ্যে এই ধারণা নিশ্চিত হয়েছে যে, মূলধারার মিডিয়া পক্ষপাতিত্ব করছে। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন পোর্টালগুলো সেই শূন্যতা পূরণ করছে। যা মূলধারার মিডিয়াগুলোর উপর অবিশ্বাসের কারণে তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশে মিডিয়ার ভূমিধসের মূল কারণ হচ্ছে মিডিয়াগুলো নিজেদের বিশ্বাস ফিরে পেতে উদাসীন। মূলধারার অনেক মিডিয়া ফেক নিউজের ব্যক্তিদের হাতে চলে। মূলধারার মিডিয়াগুলোতে অনলাইনে ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তেমন দৃশ্যমান প্রচেষ্টাও নেই, বরং শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো দৈনিক ফেক নিউজ সরবরাহ করছে যার ফলশ্রুতিতে গণমাধ্যমের উপর আস্থা আরও ক্ষুণ্ন করার ক্ষেত্রে অবদান রাখছে।

তিন, সরকারের উদাসীনতা:

আমরা প্রায়শই সরকারী কর্মকর্তাদের “গুজব” বা গুজবে না পড়তে বলার কথা শুনে থাকি। উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো হওয়া সত্বেও মানুষের অজ্ঞতা ও আবেগ নিয়ে খেলা করা ” ফেক নিউজ” এর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ফেসবুক ও টুইটার বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক ফেক নিউজ পেজ রিমুভ করে দিয়েছে।

গত দুই বছরে ফ্যাক্ট-চেকাররা অনেক ফেক নিউজের সাথে সরকার ও বিরোধীদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অনেকগুলো ফেক নিউজ সরকারের সাথে যুক্ত লোকেরা ছড়িয়ে দিয়েছিল, এমনকি কখনও কখনও মন্ত্রীরাও বিরোধীদের লক্ষ্য করে ভুল তথ্য ছুঁড়ে মেরেছে। একই সাথে বিরোধী দলগুলোও সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে লক্ষ্য করে বিষাদগার করেছে। তবে এটিকে স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, ক্ষমতায় থাকা লোকেরা ফেক নিউজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও পুরোপুরি নির্মূল করতে পারছে না।

ডিজিটাল প্লাটফর্মের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে জনসাধারণ, মিডিয়া ও সরকার এই তিন স্টেকহোল্ডার মিথ্যাচারের মহামারীকে ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। নিচে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো যা ফেক নিউজ রোধে ভূমিকা পালন করবে-

ডিজিটাল শিক্ষা:

ভুল তথ্য ও তথ্য সম্পর্কিত সমস্যা মোকাবেলায় কয়েকটি দেশ নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করছে ও কিছু দেশে ইতোমধ্যে করে ফেলছে। এই জাতীয় আইনগুলো গণতন্ত্রের বিকাশে বর্তমানের ভঙ্গুর বাক স্বাধীনতার পরিস্থিতির পরিবর্তনেএনে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল অস্ত্র হচ্ছে শিক্ষা। মিডিয়ার ও ডিজিটাল শিক্ষা ফেক নিউজের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আবশ্যক।

এই বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ফিনল্যান্ড। দেশটি ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল শিক্ষার উদ্যোগের কারণে বিশৃঙ্খলা রোধের বিরুদ্ধে সর্বাধিক নমনীয় বলে বিবেচিত হয়েছে। তারা শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষা দিচ্ছে।

সম্প্রতি, ভারতের কেরালা রাজ্যের সরকারী বিদ্যালয়গুলো একই ধরণের প্রচারণা শুরু করেছে। বাংলাদেশও এ জাতীয় কৌশলগুলো অনুসরণ করতে পারে এবং তা করা উচিত।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ফেক নিউজ বা গুজব সনাক্তকরণ সম্পর্কে পাঠকদের জন্য এখানে কয়েকটি প্রাথমিক টিপস দেওয়া হলো-
ইউআরএল চেক করা:
আপনার নিউজ ফিডে কোনও লিঙ্কে ক্লিক করার আগে প্রথমে ইউআরএলটি চেক করে নিন। এটি বিখ্যাত সংবাদ সংস্থার ” ফেক” হতে পারে, যা আপনি প্রথমে বুঝতে পারবেন না। যদি ওয়েব সাইটটির নামটি আপনার অপরিচিত হয় তবে নামটি আসলে কী তা জানতে প্রথমে নামটি গুগলে সার্চ করে দেখে নিন এটি আসল না নকল।

প্রকাশককে জানতে হবে:

ওয়েবসাইটে একটি নিবন্ধ পড়ার পরে এটি কী তা যাচাই করতে ভুলবেন না। এটি কি একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশনা? নাকি কোন ব্লগ? নাকি মতাদর্শ প্রচারের ওয়েবসাইট? ‘‘ আবাউট আস ” বিভাগটি দেখুন ও প্রকাশক সম্পর্কে আরও জানতে গুগলের সহায়তা নিন। “Who.is” গিয়ে ডোমেনের মালিক কে তা জানতে সহায়তা নিন।

তারিখটি পরীক্ষা করুন:

অনলাইনে নিবন্ধগুলো পড়ার সময় তারিখ পরীক্ষা না করা একটি সাধারণ ভুল। কখনও কখনও পুরনো বিষয় পুনরায় প্রকাশ করা হয়। যার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভুল তথ্য জানিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খ লা তৈরি করা।

অতি উৎসাহিত হবেন না:

সামাজিক মাধ্যমে একটি পোস্ট দেখার পরই শেয়ার বাটনে ক্লিক করার আগে আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করুন। কোনও নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যমে উল্লিখিত কী ওয়ার্ড বা নামগুলো দিয়ে গুগলে সার্চ দিয়ে দেখে নিন আপনি যা শেয়ার করতে চাচ্ছেন তা ফেক না আসল।

বিজ্ঞাপনে সাবধান:

সামাজিক মাধ্যমের কোনো পোস্টে যদি আশ্চার্যজনক তথ্য বা ফটো দিয়ে বলা হয় এটি দ্রুত ছড়িয়ে দিন তবে এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করুন। এই জাতীয় পোস্টে ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি থাকে। কারণ মানুষজনকে আকৃষ্ট করতে নানান ডিজাইন ব্যবহার করা হয় পোস্টে।

অতিরিক্ত বিশেষণ থেকে সাবধান:

নিউজ স্টোরি বা সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো পোস্ট পড়ার সময় বিশেষণের ব্যবহার লক্ষ্য করুন। পেশাদার সংবাদ প্রতিবেদনে কোনও চরিত্র বর্ণনা করার জন্য অতিরিক্ত বিশেষণ থাকে না; ফেক নিউজ ও প্রোপাগান্ডা নিউজে অতিরিক্ত সংখ্যায় নেতিবাচক ও ইতিবাচক বিশেষণ শব্দ ব্যবহার করা হয়।

সহায়ক হতে পারে বানান:

অনলাইন নিবন্ধগুলোতে ব্যাকরণগত ও বানানগত ভুলগুলো অ- পেশাদার পরিচয় বহন করে। যে পোর্টালের ব্যাকরণ ও বানান ভুল থাকে তবে সেই পোর্টালের উপর নির্ভর করা যাবে না।

বিপরীত চিত্র অনুসন্ধান:

কোনও ফটো বা ভিডিও ক্লিপ দেখে যদি আপনি বিভ্রান্ত হন তবে এটি সঠিক কিনা তা সিদ্ধান্তে আসতে Google Reverse Image ব্যবহার করুন। আপনার অ্যান্ড্রয়েড হ্যান্ডসেট বা কম্পিউটারকে এগুলো সক্ষম করে নিন। তাতে বিভ্রান্তি দূর হবে। ফেক নিউজ শুধু বাংলাদেশেই সমস্যা নয়। এটি এখন বৈশ্বিক সমস্যা। তবে বাংলাদেশের মতো সমাজে, এই অপকর্মটি অন্য যে কোনও দেশের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর। কারণ এখানকার লোকেরা যে কোনও ধরণের সমালোচিত সেটা প্রোপাগান্ডা হলেও তা বিশ্বাস করে।

এখন এমন এক সময় যখন পাঠক নিজেকে কী বিশ্বাস করবেন ও কী করবেন না সে সম্পর্কে যাচাইকৃত তথ্যের সমুদ্রে হাবুডুবু খায়। এমন অবস্থায় নিজেকে সুরক্ষার ভূমিকা নিজেকে পালন করতে হবে। তখন সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা পোষণ করা জরুরী। এক্ষেত্রে সরকারের অনেক কিছুই করার আছে। জনগণকে ফেক নিউজের শিকার থেকে বাঁচাতে পর্যাপ্ত মিডিয়া জ্ঞানে সজ্জিত করতে হবে। তাহলেই ফেক নিউজ বা গুজবের করাল গ্রাস থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে।

লেখক: কাদের উদ্দিন শিশির, ঢাকা-ভিত্তিক সাংবাদিক ও বিডি ফ্যাক্ট চেকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। লেখাটি দ্য ডেইলি স্টার থেকে অনূদিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

one × five =