Templates by BIGtheme NET
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ১৩ রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী
Home » অন্য পত্রিকার খবর » আইসিটি প্রকল্পে ৯৬ কেটি টাকা তছরুপ

আইসিটি প্রকল্পে ৯৬ কেটি টাকা তছরুপ

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ২৩, ২০১৯, ১:১০ অপরাহ্ণ

এস এম আববাস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের আগেই ‘আইসিটি ফেজ-২’ প্রকল্পে প্রায় শত কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগের তদন্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে এই টাকা তছরুপের অভিযোগ ওঠে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয়। কমিটির তদন্তে অনিয়মের সত্যতা উঠে আসে।

তদন্ত কমিটির প্রধান মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, ‘সরকারি টাকা কীভাবে খরচ করতে হয়, তা না জানার কারণে অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তা অনভিজ্ঞ। কিন্তু সরকারি বিধিবিধান মানা খুব জরুরি ছিল। ভেন্যুগুলো অনুপযুক্ত ছিল, ফ্যান ও লাইট ছিল না, সেগুলো ঠিক করেছে। কিন্তু এসব খরচ করতে যে কমিটি করা দরকার, সেটাও তারা করেনি।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপ রয়েছে। সে কারণে কোনও রকমে তদন্ত শেষ করা হয়েছে প্রকল্প পরিচালক ড. অধ্যাপক আব্দুস সবুর খানকে বাচাঁনোর স্বার্থে। কয়েকটি প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে দায়সারা তদন্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আগে যিনি তদন্ত কমিটির প্রধান ছিলেন, তিনি না থাকায় তদন্ত করেছি একটি নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য। সব প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমরা বেশ কিছু অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি। কম সময়ের মধ্যে যেসব অভিযোগের সতত্যা পেয়েছি তা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে আবারও তদন্ত হতে পারে। ’ তবে তদন্তে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কোনও চাপ নেই বলে জানান তিনি।

প্রকল্পে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বেসিক টিচার ট্রেনিং (বিটিটি) ও প্রতিষ্ঠান প্রধান ট্রেনিং (এইচআইটি) কোর্সের এক হাজার ১৮৯টি ব্যাচের প্রশিক্ষণ পরিচালনার মোট ৬৬ কোটি ৯৬ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ টাকা ছাড় করা হয়। দেশের ১৪টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ৫টি উচ্চ মাধ্যমিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইচএসটিটিআই) এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (বিএমটিটিআই) মোট ২০টি কেন্দ্রের বিপরীতে এই অর্থ ছাড় করা হয় সহকারী শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রশিক্ষণের জন্য।

তবে তথ্য বলছে, প্রশিক্ষণ হয়েছে নামমাত্র। এছাড়া প্রশিক্ষণ না করেই আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রকল্পের টাকা।

প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নে ছয়টি খাতের প্রশিক্ষণ উপকরণ—ব্যাগ-ফোল্ডার, ফ্লিপ-চার্ট ও নোট-প্যাড, সার্টিফিকেট, পুরস্কার, প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং পরিবহন ব্যয় প্রকল্প কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বিল পরিশোধ করা হয় প্রশিক্ষণ ভেন্যু থেকে। যা সরাসরি সরকারি ক্রয়নীতি বিরোধী। অভিযোগ ছিল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে বাড়তি টাকা নিয়ে কম খরচের প্রশিক্ষণ উপকরণ সরবরাহ করার জন্যই ক্রয়নীতি মানা হয়নি।

এসব দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ড. অধ্যাপক আব্দুস সবুর খান বলেন, ‘আমি অফিসের বাইরে, নথিপত্র না দেখে কিছু বলা যাবে না। ’
অফিসে কবে কখন পাওয়া যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মিটিং থাকে। কখন থাকতে পারবো জানি না।’

কোটেশন ছাড়াই উপকরণ কেনা হয়

অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগামী প্রিন্টার্স এবং হাসি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে কোনও টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা মূল্যের বই ও সার্টিফিকেট ছাপানো হয়। আরও প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার প্রশিক্ষণ উপকরণ এবং প্রায় ৫৩ লাখ টাকার পুরস্কার টেন্ডার কোটেশন ছাড়াই কেনা হয়েছে। এরপর এসব উপকরণ প্রশিক্ষণ ভেন্যুতে পাঠাতে পরিবহন ব্যয়ের প্রায় ২৪ লাখ টাকাও ছাড় করা হয়।

প্রশিক্ষণ ব্যয়সহ ম্যানুয়াল এবং উপকরণের ৫টি ভিন্ন ভিন্ন কোডের টাকা কৌশলে একটিমাত্র কোডে (প্রশিক্ষণ কোড- ৩২৩১৩০১) প্রশিক্ষণ ভেন্যুগুলোতে ছাড় করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ভেন্যুগুলো থেকে স্থানীয় হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে বিলের মাধ্যমে ওই টাকা উত্তোলন করে ওই ছয়টি খাতের টাকা একটি বেসরকারি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রকল্প কার্যালয়ে পাঠানো হয়। যা করা হয়েছে আত্মসাতের জন্য।

প্রশিক্ষণ না করিয়েও লুটপাট
প্রতিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নির্ধারিত সব ম্যানুয়াল যথাসময়ে পাঠানো হয়নি। ফলে অনেক কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ উপকরণ ছাড়াই প্রশিক্ষণ হয়েছে। আইসিটি প্রশিক্ষণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে ছিল না ল্যাপটপ বা কম্পিউটার। আবার অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নির্ধারিত সব ব্যাচের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়নি, তবে প্রকল্পের রিপোর্টে প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নের হার শতভাগ দেখানো হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান সব ব্যাচের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে পারেনি, তাদের টাকা বেসরকারি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামের জেলা শিক্ষা অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের ১৮২ ব্যাচের মঞ্জুরি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কম সময়ের কারণে এতোগুলো ব্যাচের ট্রেনিং করানো সম্ভব হয়নি। আমরা ১৩৭টি ব্যাচের প্রশিক্ষণ করিয়েছি। এই প্রশিক্ষণে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৮৫ লাখ ২৯ হাজার ৬০০ টাকা, ব্যয় করেছি ৬৪ লাখ ২০ হাজার ৬৪২ টাকা। বাড়তি টাকা ছিল ২১ লাখ ৮ হাজার ৯৫৮ টাকা। ’

কোন অ্যাকউন্টে এই বাড়তি টাকা ফেরত দেওয়া হয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের যে অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়া হয়েছিল সেটিতেই দিয়েছি।’

উপকরণ সরবরাহে দুর্নীতির সুযোগ ছিল কার্যাদেশে

মাথিন এন্টারপ্রাইজ, সলিড করপোরেশন এবং আনিশা এন্টারপ্রাইজকে ইস্যু করা তিনটি কার্যাদেশে একই ধরনের ট্রেনিং ম্যানুয়ালসহ প্রশিক্ষণ সামগ্রী এবং পুরস্কার সরবরাহের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে প্রায় ৭৫ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয় একই সময়ে। ট্রেনিং ম্যানুয়াল এবং সার্টিফিকেট ওই তিনটি প্রতিষ্ঠান কোথা থেকে সরবরাহ করবে তার বিবরণ নেই কার্যাদেশে। তবে ব্যাচপ্রতি ২ হাজার টাকা করে পরিবহন ব্যয় সরবরাহের উল্লেখও রয়েছে। অথচ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় কার্যাদেশে এই ধরনের ব্যয়ের শর্ত রাখার সুযোগ নেই।

আগামী প্রিন্টার্স এবং হাসি এন্টারপ্রাইজের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং সার্টিফিকেট গোপনে ছাপিয়ে মাথিন এন্টারপ্রাইজ, সলিড করপোরেশন এবং আনিশা এন্টারপ্রাইজকে সরবরাহ করা হয় প্রকল্প থেকে। এই দুর্নীতির সুযোগ রাখা হয় কার্যাদেশে।

রুম ও ভেন্যু চার্জের টাকা আত্মসাৎ
প্রশিক্ষণ কোর্সের ভেন্যু চার্জ, জনপ্রতি রুমচার্জ ও প্রতি ব্যাচের ইন্টারনেট বিল এবং প্রতি কোর্সের বিবিধ বিলসহ মোট ১৯ কোটি টাকার শতভাগ খরচ দেখানো হয়েছে। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের জন্য ভেন্যু চার্জ বা রুম চার্জের টাকা খরচের সুযোগ নেই। প্রকল্পের এই টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়নি।
এছাড়া প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি এবং প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর উপস্থিত না থাকলেও প্রতিটি কোর্সের সম্মানী নিয়েছেন। এছাড়া কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস সহায়কদের নির্ধারিত সম্মানী অর্ধেক টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে না থাকলেও প্রকল্প কর্মকর্তাদের ১ কোটির টাকার বেশি সম্মানী দেওয়া হয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও উপকরণ নিয়ে অনিয়ম
প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি জেলার ১০০টি উপজেলায় মোট ৫ হাজার ৯১৭টি ইনহাউজ টিচার ট্রেনিং কোর্স পরিচালনার জন্য ২৭ কোটি ৮৪ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ টাকা ছাড় করা হয়। এই ট্রেনিং শুরু হয় জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে। অথচ ওই কোর্সের ১ লাখ ২০ হাজার ম্যানুয়াল এবং সমসংখ্যক সার্টিফিকেট ছাপানোর জন্য ২টি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয় গত ১৭ জুন। ফলে প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ছাড়াই প্রশিক্ষণ শেষ করেন। এছাড়া একই কোর্সের ম্যানুয়াল একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছাপানো পিপিআর লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়ম।

ছয় দিনের ট্রেনিং তিন দিনে শেষ
ইনহাউজ ট্রেনিং ৬ দিনের হলেও অধিকাংশ ভেন্যুতে সকাল এবং বিকাল করে দুটি ব্যাচের প্রশিক্ষণ হয়েছে। এতে তিন দিন করে প্রশিক্ষণ হয়েছে। মাঠ কর্মকর্তাদের মতে, মাত্র তিন সপ্তহে এত ব্যাপক প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে গিয়ে প্রতিটি ভ্যেনুতে সকাল-বিকাল করে ব্যাচ আয়োজন করতে হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রায় ৪৮ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন এবং শিক্ষককদের আইসিটি প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নের নামে প্রকল্পের মোট বরাদ্দ ধরা হয়, ১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

11 − 10 =