Templates by BIGtheme NET
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
Home » মতামত » গুজবে জীবন বিপন্ন

গুজবে জীবন বিপন্ন

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ২:৫৪ অপরাহ্ণ

সাম্প্রতিক সময়ে কানেকটিভিটি এক বিরাট হুমকিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কোন জিনিস ব্যবহারের যেমন একটি ক্রিয়া আছে আবার তেমনি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও আছে। আমাদের দেশে প্রযুক্তির ব্যবহার মাঝে মাঝে মারাত্মক সামাজিক শান্তি বিনষ্ট করার কাজে ব্যবহার হতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। আবার ব্যাংকিংসহ নানা নেটওয়ার্কে অনায়াসে হ্যাকাররা ঢুকে পড়ছে। মানুষের ব্যক্তি জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অনুমান করাই যায় যে প্রযুক্তির ব্যবহারে আমরা ঠিকই অভ্যস্ত হয়েছি কিন্তু এর নেতিবাচক দিকগুলো মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে এখনও আমরা পুরোপুরি সক্ষম নই।

সাম্প্রতিক সময়ে ভোলার বোরহানউদ্দিনে ধর্মীয় উস্কানিমূলক পোস্ট দেয়ার ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শুধু ভোলাজুড়ে বললে ভুল হবে বলা যায়। দেশজুড়েই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল। এর প্রতিবাদে গত ২০ অক্টোবর প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয় ‘তৌহিদি জনতা’। সমাবেশ এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নিলে চারজন নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ হয় পুলিশসহ ৩৮ জন। আহত হয় শতাধিক। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এবং সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য মতে, ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি সাজানো নাটক। স্বার্থান্বেষী মহল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মানুষকে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নামে উস্কানি দিয়ে খেপিয়ে তুলে দেশব্যাপী একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেয়েছিল। লক্ষণীয় বিষয় ঘটনাটি ঘটেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের ঠিক কয়েকদিন পরেই। এমনিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগে থেকেই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী দেশের মানুষকে নানাভাবে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে খেপিয়ে তোলার চেষ্টায় লিপ্ত ছিল। তার মধ্যে আবার এই ঘটনা! বিবেকবান মানুষকে একটু বিচার বিবেচনা দিয়ে ভেবে দেখতে বলব আসলে ঘটনাটি কী ঘটতে যাচ্ছিল।

আজকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে উস্কানি ছড়ানো ভোলার ঘটনাটি নতুন নয়। অতীতে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কেন্দ্র করে এ যাবৎ অসংখ্য গুজবের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কোনটা রেখে কোনটার কথা বলব। অন্যদিকে দেশে হাজার হাজার ভূঁইফোড় নিউজ পোর্টাল গড়ে উঠেছে। যেগুলো নানা রকম চটকদার এবং ভুল নিউজ পরিবেশন করে থাকে। এসমস্ত নিউজ পোর্টালের বিভ্রান্তিমূলক নিউজগুলো চূড়ান্তভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার করা হয় এবং নিউজগুলো কোন প্রকার সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের আগেই ভাইরাল হয়ে যায়। মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। অঘটন যা ঘটার ঘটে যায়। তখন আর কিছুই করার থাকে না। দেশের প্রতিটি উপজেলা, জেলা, বিভাগ, রজধানী তথা দেশ জুড়ে এর দাপট। এগুলো যারা চালায় তাদের বেশিরভাগের না আছে শিক্ষাগত যোগ্যতা না আছে সাংবাদিকতার কোন মানদ-। আবার এদের কারও নিকট জবাবদিহিতারও বালাই নেই।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রযুক্তি দুনিয়ায় হ্যাকিং আমাদের জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। ব্যক্তিগত ব্যাংক এ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চুরির ঘটনা থেকে শুরু করে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্ভারে ঢুকে রাষ্ট্রীয় টাকা চুরির ঘটনাও ঘটেছে। ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নানা রকম গুরুত্বপূর্ণ ই-নথি পাচার হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন ফেসবুকে ছড়ানো গুজবে জীবন বিপন্ন হচ্ছে? কেন ভুঁইফোড় নিউজ পোর্টালের খবরে আমরা বিভ্রান্ত হচ্ছি? কেন আমাদের প্রযুক্তি জীবন বিষিয়ে উঠছে? বহির্বিশ্বে কী এসব হয় না? অবশ্যই হয়। সারা পৃথিবীতেই এখন সাইবার হামলাকে সবচেয়ে বড় থ্রেট হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বে থ্রেট মোকাবেলার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়ার পর্যাপ্ত সুবিধা আছে। আমাদের দেশে সেই সুবিধা এখনও তুলনামূলক কম। যার কারণে আমাদের জীবনে মাঝে মাঝেই খুব বেশি বিপর্যয় নেমে আসছে।

একটি চাকু ব্যবহার করে ফল কেটে খাওয়া যায় আবার সেই একই চাকু দিয়ে মানুষও খুন করা যায়! এটা নির্ভর করে এর ব্যবহারকরীর ওপর। আমাদের ভাবতে হবে ব্যবহারকারীকে ফল খাওয়ার জন্য চাকু তুলে দিচ্ছি নাকি মানুষ খুন করার জন্য। আজকে প্রযুক্তি দুনিয়া কেন আমাদের জীবন বিষিয়ে তুলছে, এর কারণ খুঁজে বের করতে হবে। ভাববার সময় এসেছে অবাধ প্রযুক্তির ব্যবহারে খানিকটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যায় কিনা? এ ব্যাপারে আমাকে কেউ ভুল বুঝবেন না দয়া করে। এখানে নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝাতে চাচ্ছি যে প্রযুক্তিটি আপনি ব্যবহার করবেন সেই নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে আপনার যথাযথ তথ্য দিয়ে আপনি অবাধ ব্যবহার করুন আপনাকে কেউ বাধা দিবে না। আমরা যেহেতু সংশ্লিষ্ট আপারেটরকে আমাদের ব্যক্তিগত পরিচিতি তথ্য এবং বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারছি প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যান্য উপকরণগুলোও এমন তথ্য দিয়ে ব্যবহার করতে পারব। কারণ এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষ অবাধ প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষম হয়ে ওঠেনি এই সত্যটি মানতেই হবে। আমাদের মতো একটি দেশে ৩ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারী আসলে কতটা সক্ষম এর সঠিক ব্যবহারে? যার যেমন খুশি কোন ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান ছাড়াই একটি ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে বসছে। এমনকি একজন মানুষ কিছুই বোঝে না অথচ পরিচিত কেউ একজন তাকে বলছে, ‘তোমার একটি ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে দেই।’ এই যে এ্যাকাউন্টটি খুলে দিলেন যিনি তার দায়িত্ব সেখানে কিন্তু শেষ। অপরদিকে যন্ত্রণাদায়ক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেলেন কিছুই না জানা ব্যক্তিটি। কারণ তিনি এর সুরক্ষা সম্পর্কে জানেন না, ব্যবহার জানেন না। ফলে ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনক্সা অনুযায়ী হ্যাকাররা খুব সহজেই এমন ফেসবুক আইডি হ্যাক করে অশান্তির বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই জায়গাটিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা যেতে পারে। যেমন ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্রের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হোক এবং তথ্যগুলো নির্বাচন কমিশন সার্ভারের সঙ্গে যাচাই করার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হোক। একটি জতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ কয়টি ফেসুবুক এ্যাকাউন্ট চালাতে পারবে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হোক। খেয়াল করে দেখবেন সিম নিবন্ধনে কড়াকড়ি আরোপের ফলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ প্রায় নির্মূলের পথে। ফেসবুকেও এমন নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলে এই মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ অনেকাংশে কমে যাবে বলে আশা করা যায়।

সরকার ইতোমধ্যে নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের নীতিমালা গ্রহণ করেছে এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। যথাযথভাবে যাচাই বাছাই করে এটি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। নিউজ পোর্টাল নিবন্ধনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে কতগুলো ইলেট্রনিক্স, প্রেস, অনলাইন গণমাধ্যম চলতে পারবে তারও একটি সংখ্যা নির্ধারণ করা হোক। একই সঙ্গে ইলেট্রনিক্স, প্রেস, অনলাইনসহ দেশের সকল গণমাধ্যম সম্পাদক এবং মফস্বল থেকে রাজধানী সকল পর্যায়ে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেয়া হোক। বিশেষ করে দেশের মফস্বল পর্যায়ে এমনও দেখা যায় প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ভূঁইফোড় গণমাধ্যমের সাংবাদিক এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন কেউ কেউ। সরকারী বেসরকারী যে কোন চাকরিতে যদি শিক্ষাগত যোগ্যতার ব্যাপারটি থাকতে পারে তাহলে সংবাদ মাধ্যমে কেন থাকবে না। কারণ এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পেশা। শিক্ষা ছাড়া এই পেশায় শৃঙ্খলা আনা এবং চটকদার গুজব ছাড়ানোর মতো নিউজ বন্ধ করা অসম্ভব।

অন্যদিকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় হ্যাকিং রোধে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। গত বছর মহান জতীয় সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস হয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধের দ্রুত ও কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।

এত কিছুর পরেও সাইবার অপরাধ সংঘটিত হয়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ জনসচেতনতা ও আপামর জনগণের প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে সক্ষমতার অভাব। আমাদের দেশে কোন কিছুর নেতিবাচক দিক চিন্তা না করেই ব্যবহার শুরু করে দেয়া হয়। পরে যখন অঘটন ঘটে তখন আর কিছু করার থাকে না। ভাবতে হবে কার হাতে কী তুলে দিচ্ছি? দেশের আপামর জনসাধারণ সেই জিনিসটি ব্যবহারে সক্ষম কিনা? এজন্যই জোর দিয়ে বলতে চাই, একটি নিয়মের মধ্যে এনে মানুষকে প্রযুক্তি দুনিয়ায় প্রবেশ করানো হোক। নিয়মের মধ্যে থেকে প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার হোক তাতে খুব বড় ধরনের কোন ক্ষতি হবে না। নইলে যে অবস্থার দিকে আমরা যাচ্ছি এভাবে চলতে থাকলে ভয়াবহ পরিণতির মধ্যে আমাদের পড়তে হবে। ভবিষ্যতে এদেশে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং ভূঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমি আশঙ্কা করছি এই দুটি মাধ্যম ব্যবহার করে শুধু নানা মত, নানা পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে গুজব সৃষ্টির মাধ্যমে বিভেদের দেয়াল রচনা করে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধও বেধে যেতে পারে। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহারের নীতিমালাই ভবিষ্যতের ভয়াবহ বিপর্যয় ঠেকাতে পারে। যে কোন মূল্যে প্রযুক্তি দুনিয়ার গুজবের গজব ও হ্যাকিং থেকে আমাদের বাঁচতেই হবে।

লেখক : সাজ্জাদ কাদির, গণমাধ্যমকর্মী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

nine + three =