Templates by BIGtheme NET
৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২১ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ২২ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
Home » মতামত » লাদেন থেকে বাগদাদি সন্ত্রাসবাদের অবসান হবে কি?

লাদেন থেকে বাগদাদি সন্ত্রাসবাদের অবসান হবে কি?

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ৯:৩৯ পূর্বাহ্ণ

২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদ শহরে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ওসামা বিন লাদেনকে। মার্কিন মেরিনের ‘সিল’-এর প্রশিক্ষিত ও দক্ষ কমান্ডোরা খুঁজে পেলেন লাদেনকে। গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল তার দেহ। হোয়াইট হাউজের একটি বিশেষ রুমে খুব ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ওবামা টিভিতে দেখছিলেন ‘সিল’-এর সেই ‘অপারেশন’-এর দৃশ্য। দৃশ্যপটে এবারে সিরিয়ার ইদলিব প্রদেশের বারিশা এলাকা। কয়েকটি হেলিকপ্টার আর বিশেষ একটি বাহিনী উড়ে গেল বারিশায়। লাদেনের মতো বাগদাদিকে তারা টিভি দেখা অবস্থায় পায়নি। বাগদাদি একটি সুড়ঙ্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং একপর্যায়ে তিন সন্তানসহ নিজেকে উড়িয়ে দেন। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় একটি সন্ত্রাসবাদী যুগের। অ্যাবোটাবাদ আর বারিশা– মিল আরও আছে। অ্যাবোটাবাদ মিশনেও নেভি-সিলের কমান্ডোরা সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল একটি বেলজিয়াম ম্যালিনওয়া জাতের কুকুর। নির্দেশ পেলে এই ধরনের কুকুর নাকি এক পলকেই হয়ে উঠতে পারে আক্রমণাত্মক। বারিশা অভিযানেও সঙ্গে গিয়েছিল ওই ম্যালিনওয়া জাতের এক কুকুর। কুকুরটি ধাওয়া করে বাগদাদিকে একটি সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রবেশ করতে বাধ্য করেছিল। আরও মিল আছে। লাদেনের মৃতদেহ গভীর সাগরে ফেলে দিয়েছিল নেভি-সিলের সদস্যরা। আর গেল শনিবারের বারিশা অভিযানের পর মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি বলেছেন, ‘বাগদাদির দেহাবশেষ একটি সুরক্ষিত জায়গায় নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছিল। তারপর সেই দেহাবশেষ যথার্থ প্রক্রিয়া মেনে সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়।’ এর আগে ডিএনএ পরীক্ষায় এটা নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে, নিহত ব্যক্তি বাগদাদিই।

এখন বাগদাদি যুগের অবসান হলো। আগেই লাদেন চ্যাপ্টারেরও অবসান হয়েছিল। এতে করে কি বিশ্বে সন্ত্রাসবাদের অবসান ঘটবে? এ প্রশ্ন এখন সর্বত্রই। গণমাধ্যমে যেমনি এ প্রশ্নটি আলোচিত হচ্ছে, ঠিক তেমনি বিভিন্ন গবেষকের লেখায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। অনেকেই বলার চেষ্টা করেছেন এরপর কী? বিখ্যাত ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে (২৮ অক্টোবর) কলিন পি. ক্লার্ক ও অমরনাথ অমরাসিঙ্গমে লিখেছেন, The Islami states next leader will have a hard time bringing disparate groups with competing agendas together|। একই ম্যাগাজিনের আরেকটি ভাষ্য– ‘Killing the Islamic state leader will not kill his ideas’ (২৯ অক্টোবর)। শিরিন হান্টার মন্তব্য করেছেন– ‘Without Regional stability, The Resurgence of the Islamic State or Emergence of Nwe Terror Groups is Inevitable’। ইসলামিক স্টেটের ভবিষ্যৎ কী– এটা নিয়েও Foreign Policy Research Institute-এ ক্লিন্ট ওয়াটস মন্তব্য করেছেন, আইএস প্রতিশোধ নিতে পারে (অক্টোবর ২৭)। একজন নয়া আইএস নেতার নাম পাওয়া গেছে এরই মধ্যে।

নিঃসন্দেহে বাগদাদি ভুল করেছিলেন। ভুল করেছিলেন ওসামা বিন লাদেনও। আর তালেবানরাও ভুল করছে আফগানিস্তানে। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখন ছড়িয়ে পড়ছে আফ্রিকাতে। নাইজেরিয়াতে বোকো হারাম কিংবা সোমালিয়ায় আল শাবাব গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার ছাপা হয়েছে। বোকো হারাম আইএসের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু তারপরও তারা বোকো হারামকে নাইজেরিয়া থেকে উৎখাত করতে পারেনি। আর সোমালিয়া একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ফলে, একটা প্রশ্ন থাকবেই– বাগদাদি-পরবর্তী এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আদৌ বন্ধ হবে কি-না? আমরা আফগানিস্তানের কথাও বলতে পারি। আফগানিস্তানের একটা বিশাল এলাকা তালেবানদের দখলে থাকলেও আইএস জিহাদিদের একটা অংশ সিরিয়া-ইরাক থেকে উৎখাত হয়ে আফগানিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। এদের কর্মকাণ্ডও মাঝেমধ্যে সংবাদের জন্ম দেয়। আইএসের সংবাদমাধ্যমে আইএসের পাকিস্তান-ভারত উপমহাদেশের শাখা গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। একজন আমিরের নামও (ছদ্মনাম) তারা ঘোষণা করেছিল। এখন তাদের কী হবে? বাস্তবতা হচ্ছে, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর আল-কায়েদা বিলুপ্ত হয়নি। জাওয়াহিরির নেতৃত্বে আল-কায়েদা তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। যদিও আগের মতো শক্তি তাদের নেই। বাগদাদির মৃত্যুর পর নতুন আইএস নেতার নাম ঘোষণা করা হয়েছে– তিনি হচ্ছেন আবদুল্লাহ কারদাস। বলা হচ্ছে, কারদাস ইরাকি সেনাবাহিনীর সাবেক এক ঊর্ধ্বতন সেনা কমান্ডার। সুতরাং আইএসের ইচ্ছাটা পরিষ্কার। বাগদাদির অবর্তমানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু ওসামা বিন লাদেনের অবর্তমানে আল-কায়েদা যেমনি ঝিমিয়ে পড়েছে, ঠিক তেমনি বাগদাদির অবর্তমানে আইএস তেমনি বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। ওসামা বিন লাদেনের পর বাগদাদি যুগের অবসান ঘটল। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বে সন্ত্রাসী যুগের অবসান হোক– এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা যায় না– বাগদাদির মৃত্যু এই সত্যটি আবার প্রমাণ করল। তবে একটা মৌলিক প্রশ্ন এখানে আছে। আর তা হচ্ছে বাগদাদি-পরবর্তী রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কি-না? অর্থাৎ ‘নাইন-ইলেভেন’-এর পর যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, সেই যুদ্ধের অবসান হবে কি-না? সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো সমস্যায় আছে? আফগানিস্তান থেকে তিনি পরিপূর্ণভাবে বের হয়ে আসতে পারছেন না। তালেবানদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনারও জট খুলছে না। সেখানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও, এখন অবধি ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। লেবানন আর ইরাকে অসন্তোষ বাড়ছে। সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্র কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। এ ড়্গেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি আদৌ পরিবর্তন হয় কি-না, সেটা দেখার বিষয়। আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক ধরনের ‘ইমপিচমেন্ট’-এর সম্মুখীন হয়েছেন। প্রতিদিনই এটা নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। এমনি এক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বাগদাদিকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে এবং তাকে হত্যা করে জনমত তার পক্ষে নিতে চাইবেন– এটাই স্বাভাবিক। আগামী নির্বাচনে এটা একটা ইস্যুও হতে পারে। ফলে একজন লাদেনকে হত্যা করে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর যেমনি অবসান হয়নি, এখন একজন বাগদাদিকে হত্যা করেও এই ‘যুদ্ধ’ শেষ হবে না। তবে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা হয়তো এখন চিন্তা করতে পারেন আর কত দিন ধরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই ‘যুদ্ধ’ পরিচালিত হবে? ১৮ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছে। এই যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে আফগানিস্তান, পরে ইরাক দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু কোনো ঘটনাই যুক্তরাষ্ট্র তার লক্ষ¨ অর্জন করতে পারেনি।

Information clearing Houseনামে একটি নিউজ পোর্টাল আমাদের জানাচ্ছে (অক্টোবর ৩০, ২০১৯) ২০০১ সালে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ অবধি এই যুদ্ধের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৪ দশমিক ৯২ ট্রিলিয়ন ডলার। এরই মধ্যে এই ‘যুদ্ধে’ যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ৪ হাজার ৮০১ জন সৈনিক মারা গেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে পরিপূর্ণভাবে সফল সেনা প্রত্যাহার করে নিতে চাচ্ছেন। সীমিত কিছু সেনা অফিসার সেখানে এখনো আছেন, যারা শুধু প্রশিক্ষণের কাজে সেখানে নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু তালেবানদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সেখানকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আজও সেখান থেকে প্রতিদিনই আত্মঘাতী বোমা হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই যে পরিস্থিতি, এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই যুক্তরাষ্ট্রের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ সন্ত্রাসী বাগদাদির বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযান সফল হলো। বাগদাদি চ্যাপ্টারের অবসান হলো। কিন্তু এরপর? আহমেদ চারাই বিখ্যাত The National Interest  ম্যাগাজিনে লিখেছেন (৩১ অক্টোবর) ‘Bagdadi’s Death Creates an opportunity for Peace in the Middle East’। তার লিখিত প্রবন্ধের শিরোনাম এটিই। তিনি বলতে চাইছেন, বাগদাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার একটা সম্ভাবনা তৈরি হবে। মধ্যপ্রাচ্যের জনগণ কেন বলি, সারা বিশ্বেরই এটা প্রত্যাশা, মধ্যপ্রাচ্যে শািন্ত আসুক। আর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি নিশ্চিত হলে বিশ্বেও শান্তি আসবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অশান্তির জায়গাটাই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে উৎখাতের লক্ষে¨ই আইএস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সিরিয়া সংকটে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া সাময়িকভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে সিরিয়া থেকে আইএস উৎখাত হয়েছে বটে কিন্তু সেখানকার সংকট নতুন একটি মাত্রা পেয়েছে তুরস্ক যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার কারণে। সৌদি-ইরান সংকটের গভীরতা বাড়ছে। ইয়েমেনের পরিস্থিতিও জটিল হচ্ছে। ইরাক ও লেবাননে গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর লিবিয়া একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন তাই এখানেই, এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে কি না? বাগদাদির অপসারণের মধ্য দিয়ে সেই শান্তি কতটুকু প্রতিষ্ঠিত হয়– সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক : তারেক শামসুর রেহমান

প্রফেসর ও রাজনৈতিক বিশেস্নষক

[email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

five × 2 =