Templates by BIGtheme NET
২৮ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং , ১৪ রবিউল-আউয়াল, ১৪৪১ হিজরী
Home » অন্য পত্রিকার খবর » রাজারবাগ পীর সিন্ডিকেটের দখলবাজি!

রাজারবাগ পীর সিন্ডিকেটের দখলবাজি!

প্রকাশের সময়: নভেম্বর ৪, ২০১৯, ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ

রাজারবাগ পীরের অনুসারীরা মামলার জালে ফাঁসিয়ে রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাজার হাজার একর জমি হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পীরের অনুসারীদের এসব দখলসংক্রান্ত অভিযোগ জমা হয়েছে। তাতে ‘সাইয়্যিদুল আ-ইয়াদ শরীফ (রাজারবাগ শরীফ) পীরের মুরিদান ও তাদের কুচক্রী ভূমিদস্যু মামলাবাজ সিন্ডিকেটের জমি, বাড়ি-ভিটা দখলের ও লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ’ করার অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা অভিযোগ পেয়েছি। দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ হওয়ায় সেটা অনুসন্ধানের বিষয়ে কমিশনের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।’ দুদকে জমা হওয়া অভিযোগে বলা হয়, রাজারবাগী পীর সায়্যেদ দিল্লুর রহমানের অনুসারীরা আল বায়্যেনাত গ্রুপের নামে বান্দরবানের ঈদগড়, ইয়াংছা, সাঙ্গু ও ফাইস্যাখালী মৌজার প্রায় ৬ হাজার একর পাহাড়ি ভূমি, চাষের জমি, সরকারি খাসজমি ও ভিটা-বাড়ি তাদের দখলে নিয়েছে। পীরের সিন্ডিকেট মুরং, মারমা, ত্রিপুরা ও বাঙালিদের ভিটে-মাটি কেড়ে নিয়েছে। রাজারবাগ পীরের সংগঠন উলামা আঞ্জুমান আল বাইয়্যিনাত, মোহাম্মাদীয়া জামিয়া শরীফ, সাইয়্যিদুল আইয়াদ শরীফের নামে এসব দখলবাজি চালিয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা প্রথমে আর্থিকভাবে সচ্ছল মানুষকে টার্গেট করে মামলা দেয়। মামলা তুলে নেওয়ার নামে তাদের সহায়-সম্পদ হাতিয়ে নেয় রাজারবাগ পীরের অনুসারীরা। বান্দরবানের লামা উপজেলার গহীন বনাঞ্চল মম্বিরছড়া, আমতলী ও কেয়ামাং ত্রিপুরা পাড়ার ৫৬টি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। তাদের কৌশল সম্পর্কে স্থানীয়রা জানায়, আল বায়্যিনাত গ্রুপের নামে প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার নামে একখ- জমি চায় রাজারবাগ পীরের অনুসারীরা। যার নেতৃত্বে ছিলেন পীরের খাস মুরিদ আনিসুর রহমান ওরফে লাদেন মৌলভি। পরে তারা মম্বিরছড়ার মারমা পাড়ার ৪০টি, কেয়ামাং ও আমতলী পাড়ার ১৬টি পরিবারকে উচ্ছেদ করে। পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন উপজাতীয় ‘হেডম্যান’ ও বাঙালি ‘কারবারি’দের ‘হাত করে’ সাধারণ মানুষের শত শত একর জমি লিখে নেয়। সেখানে রাবারবাগান ও বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করা হয়। প্রথমদিকে সেগুলো তদারকি করতেন কক্সবাজারের রামুর তৈয়ব উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আনিসের কাছে খরচের টাকা চাইতেই আমার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় একে একে মামলা হতে থাকে। পরে তাকে প্রস্তাব দেওয়া হয় সমঝোতার। সেই সমঝোতার নামেও ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় আনিস।’

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি থানার বাইসারী ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার সাহাবুদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আল বাইয়্যিনাত বা লাদেন গ্রুপের দখলি জমিতে গাছের চারা রোপণ করে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এ নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে তার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে দুটি ও ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে মানব পাচারের একটি মামলা দেওয়া হয়। পরে লামার ফাইস্যাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদারের মাধ্যমে সমঝোতা করা হয়। এজন্য তাকে ৭ লাখ টাকা চাঁদা দিতে হয়েছে।

লামা থানার মম্বিরছড়া এলাকার রবার্ট ত্রিপুরা জানান, রাজারবাগী পীরের অনুসারীরা তাকে মামলায় ফাঁসিয়ে ভিটে-মাটি আর ফসলি জমি সব হাতিয়ে নিয়েছে। এখনো তার ওপর চলছে মামলার খড়গ। একই এলাকার মুক্তারাম ত্রিপুরার জানান, স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর পর তারা পরিদর্শনেও আসে। কিন্তু তারা বেদখল হওয়া ভিটেমাটি ফিরে পাননি।

লামা থানার ফাইস্যাখালী ইউনিয়ন পরিষদের গয়ালমারার সৈয়দ জিন্নাত আলী কুতুবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভিটে হারানো উপকূলীয় বাসিন্দাদের পুনর্বাসনে লামা থানার ২৮৫ নম্বর সাঙ্গু মৌজায় ৩৮৫ একর জমি বন্দোবস্ত দেয় সরকার। ৭৭টি পরিবার ৫ একর করে করে জমি বন্দোবস্ত পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস এবং চাষবাস করে আসছিল। সেই জমির ওপরই নজর পড়ে রাজারবাগ পীরের অনুসারীদের। জাল কাগজ তৈরি করে প্রায় ৩০০ একর জমি ভিটা-বাড়িসহ দখল করে নেয় তারা। সেখানে মোহাম্মদীয়া জামিয়া শরীফ নামে তাদের আস্তানা করা হয়। পীরের পক্ষে দখলে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় জাকের হোসেন, মুসলিম উদ্দিন, মুজিবুল হক, লুৎফর রহমান, মোহাম্মদ সেলিম ও নূরুল আলম।’ জিন্নাত আলী কুতুবী জানান, আগামী বুধবার চট্টগ্রাম জজ কোর্টে প্রতারণার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সবকিছু তুলে ধরবেন। তিনি বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে মামলাবাজির শিকার হয়ে বহু লোক জেলে আছে। আমার নামেও মানব পাচারের তিনটি, হত্যা মামলা একটিসহ সাতটি মামলা দেওয়া হয়েছে।’

লামার সাঙ্গু মৌজার মুক্তারাম কারবারি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাঙ্গু মৌজায় রাজারবাগী পীরের একটি আস্তানার জন্য প্রায় এক হাজার একর জমি দখল করা হয়েছে। আমি এলাকার সচেতন নাগরিকদের নিয়ে প্রতিবাদ করায় তারা আমার বিরুদ্ধে ডাকাতি-দস্যুতার তিনটি মামলা দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৪ সাল থেকে এসবের প্রতিবাদ করে আসছি। জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি দিয়েছি। কিন্তু প্রতিকার পাচ্ছি না।’

অভিযোগ আছে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থানার মধ্য বেতছড়ির আবুল হোসেন লিডার, তার ছেলে নুরুল আলম ও খলিল হাওলাদারের কাছ থেকেও জোর করে ১১ একর জমি হাতিয়ে নিয়েছে রাজারবাগী পীরের অনুসারীরা। আবুল হোসেন লিডার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাবাজ এই পীরের অনুসারীরা আমাদের কাছ থেকে ৬ একর জমি আল বায়্যিনাত মসজিদের নামে, চার একর আঞ্জুমানের সভাপতি শমসের কাদের ও এক একর পীরের আরেক মুরিদ মন্নেস আলী নিয়েছে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা ও রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক পাওয়া মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সোহেল চৌধুরীর অভিযোগ, রাজারবাগ পীরের অনুসারী কামাল মিয়া তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের নয়নপুরে তার দুটি বাড়ি দখল করে নিয়েছে।

ঢাকার আশুলিয়া থানার চারাবাগ এলাকার মাহবুবর রহমান খোকনের মেয়ে মুনিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসাইদ মোজায় ৬০ শতাংশ জমি রাজারবাগের পীরের লোকজন দখল করে নিতে চায়। জমি লিখে না দেওয়ায় আমার বাবার নামে বান্দরবানের লামা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কেরানীগঞ্জে পাঁচটি মামলা দিয়েছে। এর মধ্যে লামা থানার মামলাটি মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। একটি মামলায় আমার বাবা এখনো জেলে আছেন।’ মুনিয়া জানান, একইভাবে তার চাচাতো ভাইকেও ৬০ শতাংশ জমি দরবারের নামে লিখে দিতে বলে।

অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর ৮৭০ শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা একরামুল হাসান কাঞ্চনকে ৪৬টি মামলায় ফাঁসিয়ে শান্তিবাগে তার পৈতৃকবাড়ি ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ডাইং ফ্যাক্টরি দখলের চেষ্টা করেছে পীরের সিন্ডিকেট। তার বিরুদ্ধে অধিকাংশ মামলার বাদী রাজারবাগী পীরের মুরিদ শাকেরুল কবীর। তারই আপন বড়ভাই শাহেদুল কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাঞ্চনের পৈতৃকবাড়ি ও ব্যবসা দখল করার জন্য এসব মামলা দিচ্ছে তারা। এসব মামলার কারণে কাঞ্চনের পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজারবাগ দরবার শরিফের মুখপাত্র আল্লামা মুহাম্মদ মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এর সবই সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুয়া। রাজারবাগ দরবার শরীফের পীর সাহেবের বিদ্বেষী লোকজন এসব অপপ্রচার করছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

eighteen − three =