Templates by BIGtheme NET
৩০ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১৫ সফর, ১৪৪১ হিজরী
Home » বিবিধ » নারীরাই কি দায়ী ডিভোর্সের জন্য?

নারীরাই কি দায়ী ডিভোর্সের জন্য?

প্রকাশের সময়: অক্টোবর ৬, ২০১৯, ৯:১৭ পূর্বাহ্ণ

লিপি অসম্ভব মেধাবী ছাত্রী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট সে। পিতৃহীন সংসারে সে সবার আশার আলো। ডাক্তারি পড়বে সে- এমন আশা নিয়ে বাসার সবাই তার দিকে চেয়ে আছে। এসএসসি পাসের পর কলেজে গিয়ে লিপি প্রেমে জড়িয়ে পড়ল। বাসার সবাই তাকে সতর্ক করল, বোঝালো- এটি প্রেমের সময় নয়, এখন সময় লক্ষ্য ঠিক রাখার। পড়তে হবে। ছেলেকেও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বলো।

দুইজন স্বনির্ভর হয়ে বিয়ে করো, আমাদের কারও কোনো আপত্তি নেই। অনেক শাসানো, বোঝানোর পরও লিপি একদিন সেই ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গেল। সবাই কিছুদিন শোকে স্তব্ধ হয়ে থাকল। এর পর লিপির মায়ের উদ্যোগে ছেলের পরিবারের সঙ্গে মিলমিশ হলো। লিপিকে আবার পড়ায় মন দিতে বলা হলো। কিন্তু এর মধ্যেই সে সন্তানসম্ভবা। পর পর দুই সন্তান হওয়ায় তার পড়াশোনার সব সম্ভাবনা শেষ হলো। লিপির সংসারে শুরু হলো নতুন অধ্যায়। তার স্বামী নেশাগ্রস্ত, নানা নেশা করে এসে রোজই মারধর চলে।

তার শ্বশুর-শাশুড়ি কেউই বিষয়টি সামলাতে পারছে না। অবশেষে দশ বছরের সংসার ছেড়ে সে বাবার বাড়ি ফিরে এলো। এলেই তো সব মিটে যায় না। সাবেকের অত্যাচার তো থাকেই, সন্তানের আছিলা থাকে। শেষে অতিষ্ঠ হয়ে সন্তানদের মায়ের কাছে রেখে ঢাকায় ভাইয়ের কাছে থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করছে লিপি।

গল্পটির কাছাকাছি অনেকের গল্পই মিলে যাবে। অনেকের ঠাঁই নেওয়ারও জায়গা থাকে না। তবু বিচ্ছেদ হয়। তবে শতকরা ৯৯ ভাগ নারী ডিভোর্স নেন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে। তবু পুরুষশাসিত সমাজ বলবে, ডিভোর্সের প্রচলন বেড়ে যাওয়ার জন্য নারীরাই দায়ী। নারীও মানুষ। তারও অধিকার আছে নিজ ইচ্ছায় স্বাধীনভাবে বাঁচার। পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের অবস্থা আসলে ওই চা বাগানের শ্রমিকদের মতো। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য কোনো স্কুল বা শিক্ষালয় নেই। কারণ তারা শিক্ষিত হলে শ্রমিক হবে কে? এখনো অনেক পরিবারে বলা হয়- মেয়েদের বেশি পড়াশোনার দরকার নেই, বেশি পড়াশোনা জানলে স্বামীর বশে থাকবে না।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিশ্বব্যাপী প্রবণতা হলো- নারীরা সহজে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন না। বাংলাদেশে নারীদের পক্ষ থেকে তালাকের আবেদন কেন বাড়ছে, তা নিয়ে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। অনেক ক্ষেত্রেই মেয়েদের মতামত ছাড়া কম বয়সে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, বেশি বয়সী লোকের সঙ্গেও অভিভাবকরা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। একটা পর্যায়ে গিয়ে এ ধরনের বিয়েগুলো টিকছে না।

বর্তমানে অনেক নারী বাইরে কাজ করছেন। কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাইরে কাজের পাশাপাশি ঘরের সব দায়িত্বও নারীকেই সামলাতে হচ্ছে। দ্বৈতভূমিকায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একপর্যায়ে নারীরা হাঁপিয়ে পড়ছেন। আর অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হলে তালাকের মতো সিদ্ধান্ত নিতে সাহসী হচ্ছেন।

সংসার টিকিয়ে রাখার দায় শুধু মেয়েদের- এমন ভাবনার অবসান হওয়া দরকার। সংসার যদি দুজনের হয়, তা হলে তা টিকিয়ে রাখার সদিচ্ছা দুজনেরই সমান হওয়া দরকার। সংসারের প্রতি দুজনেরই সততা, একনিষ্ঠতা আর মমত্ববোধ থাকতে হবে। যে কোনো জিনিস জুড়ে থাকার জন্য দুইপাশের ভার সমান হওয়া জরুরি। শুধু নারীর প্রতি দায় চাপালেই সমাধান মিলবে না। সন্তানও দুজনেরই। তার ভবিষ্যৎ ভাবনাও দুজনেরই সমান হওয়া উচিত। ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুনে’- এই খ-িত উক্তি থেকে বের হয়ে পুরোটি বলার সময় এসেছে। ‘সংসার সুখী হয় রমণীর গুণে, সদগুণ পতি যদি থাকে তার সনে’। দিন বদলাচ্ছে। ওইদিন আর নেই- স্বামী রাতভর বাইরে ফুর্তি করে কাটিয়ে আসবে আর স্ত্রী অধীর হয়ে স্বামীর প্রতিক্ষায় কাটাবে।

বিচ্চেদের জন্য নারীরাই দায়ী- এমন একপেশে অভিযোগ খ-নের সময় এসেছে। যতই বলো, সামাজিক মাধ্যম কিংবা মেয়েদের শিক্ষিত হওয়া ডিভোর্সের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার জন্য দায়ী- এটি সর্বাংশে মিথ্যা। নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব।’ কাজেই পুরুষত্বান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর সময় এসেছে। সময় এসেছে নারীকে তার যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার।

কথাসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবী বলেছিলেন, ‘মানুষের গড়া সমাজে মানুষের এমন দুর্গতি কেন? কেন এত অসাম্য?’ তার জীবন অবরোধের মধ্যে কেন?’ এই হাজারো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। পুরুষের জন্য শুধু নারী নিবেদিত হবেন কেন? নারীকে ঘিরে পুরুষের সব ‘নিবেদন’ কেবল কবিতা কিংবা সাহিত্যেই আমরা দেখতে পাই। বাস্তবের সাংসারিক জীবনে নারীর পাশাপাশি পুরুষ কবে নিবেদিত হবেন? পুরুষকে হতে হবে গণতান্ত্রিক। তার মনোভূমি থেকে উপড়ে ফেলতে হবে নারীকে দাবিয়ে রাখার ‘প্রবণতা গাছ’। তবেই ঘুচবে বৈষম্য এবং দেশ হবে নারী-পুরুষ সবার, সব মানুষের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

14 + 3 =