Templates by BIGtheme NET
১ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ১৬ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী
Home » অর্থনীতি » গণছাড় ও নতুন ঋণ চায় বড় খেলাপিরা

গণছাড় ও নতুন ঋণ চায় বড় খেলাপিরা

প্রকাশের সময়: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৯, ৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ

ডেস্ক: ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা কমাতে সরকার খেলাপিদের গণছাড় সুবিধা ঘোষণা করেছে। তবে গণছাড় সুবিধাভোগীদের নতুন করে ঋণগ্রহণ আটকে দিয়েছেন উচ্চআদালত। এ অবস্থায় বিশেষ গণছাড় সুবিধাগ্রহণের আগ্রহ নেই বড় অঙ্কের খেলাপিদের।

খেলাপি ঋণের বিপর্যস্ত সরকারি ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে গ্রাহকরা জানাচ্ছেন, নতুন করে ঋণ না পেলে পুনঃতফসিল সুবিধা গ্রহণ করা অযৌক্তিক। তারা নতুন করে ঋণ নিয়ে শিল্প বা ব্যবসা চালু করার সুযোগও দাবি করেন। তাই এ পর্যন্ত বড় ব্যাংকগুলোয় মাত্র ১১০০ গ্রাহক আবেদন করেছেন সুবিধা নেওয়ার জন্য। তবে শীর্ষ খেলাপিরা এখনো আবেদন করেননি। এদিকে সেই আবেদনের সীমা কাল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আবার বাড়িয়ে ২০ অক্টোবর করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশে বর্তমানে ঋণখেলাপির সংখ্যা এক লাখ ৭০ হাজার ৩৯০ জন। তাদের কাছে আটকে থাকা খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় এ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা জানান, তাদের খেলাপি ঋণের বড় অংশই রয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের পকেটে। বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা আবেদন করেননি। ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন কারণে ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে নতুন করে ব্যবসা চালু করার সুযোগও পাচ্ছে না। সরকার ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা ঘোষণা করেছে। কিন্তু নতুন করে ঋণ না পেলে এ সুবিধা তাদের জন্য আসলে কোনো কাজে আসবে না। ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান চালুর জন্য নতুন করে ঋণ দাবি করছেন তারা।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা ঘোষণার পর অনেক গ্রাহক কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই সুবিধার আওতায় পুনঃতফসিল করে নতুনভাবে আরও ঋণ দাবি করেছেন। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আসা কয়েক ডজন চিঠিতে তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করে ঋণ প্রদানে ব্যাংককে নির্দেশ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সর্বশেষ পাওয়া হিসেবে সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে জনতা ব্যাংকে। গতকাল পর্যন্ত ৪৬৬টি আবেদন এসেছে, যারা ডাউনপেমেন্ট হিসেবে জমা দিয়েছেন ৮৪ কোটি টাকা। অথচ ব্যাংকটি খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা। শীর্ষ খেলাপিদের মধ্য থেকে মাত্র ২ জন স্বেচ্ছায় যোগাযোগ করেছেন। তবে তারা নতুন ঋণ পাওয়ার নিশ্চয়তা দাবি করেছেন।

অন্যদিকে অগ্রণী ব্যাংকের ৯ কোটি টাকা জমা দিয়ে আবেদন করেছেন মাত্র ১০০ গ্রাহক। ওই গ্রাহকদের কাছে মোট পাওনা ৪০০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণ ৬ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির এমডি মো. শামস-উল ইসলাম বলেন, অনেক গ্রাহকই যোগাযোগ করছেন। পুনঃতফসিলের পাশাপাশি তারা নতুন ঋণ দাবি করছেন। তবে নতুন ঋণ দেওয়া হবে কিনা সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতির বিষয়। নতুন করে ঋণ দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে এ সুবিধা গ্রহণকারীরা আরও বেশি উদ্বুদ্ধ হবে।

সোনালী ব্যাংকে আবেদন এসেছে ২২২টি। এর বিপরীতে ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ব্যাংকটি পেয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে রূপালী ব্যাংকের ১২০ আবেদনকারী জমা দিয়েছেন ১০ কোটি টাকা।

খেলাপি জর্জরিত বেসিক ব্যাংকে ২০০টি আবেদন জমা পড়েছে। সব মিলিয়ে ডাউনপেমেন্ট হিসেবে ৮ কোটি টাকা পেয়েছে ব্যাংকটি। এই ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মোট ঋণের ৬০ শতাংশ বা ৯ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের এমডি রফিকুল আলম বলেন, শাখা পর্যায়ে অনেক আবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া বড় অঙ্কের ঋণগ্রহীতারা এখনো আবেদন করেননি। আবেদনের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। আমরা আশা করছি এই বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালার আওতায় আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে চায়।

তবে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করছে। এসব ব্যাংকে আবেদন অনেক কম। ন্যাশনাল ব্যাংকের মাত্র ১২টি আবেদন জমা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যেসব অভিযোগ গেছে, তার অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে, যে ওই ব্যাংকগুলো বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দিচ্ছে না।

তবে খেলাপির শীর্ষে থাকা সামানাজ সুপার ওয়েল (এক হাজার ৪৯ কোটি টাকা), গ্যালাক্সি সোয়েটার অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং (৯৮৪ কোটি টাকা), রিমেক্স ফুটওয়্যার (৯৭৬ কোটি টাকা), কোয়ান্টাম পাওয়ার সিস্টেম (৮২৮ কোটি টাকা), রূপালী কম্পোজিট লেদার ওয়্যার (৭৯৮ কোটি টাক), ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টস (৭৭৬ কোটি টাকা) এসব গ্রুপ আবেদন করেনি। এরা বেশিরভাগই সরকারি ব্যাংকগুলোর ঋণখেলাপি। তারা ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন সুবিধার পর নতুন করে ঋণ পাওয়া যাবে কিনা।

নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণের পর পরই বলেছিলেন, এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না। কীভাবে খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যায়, সে জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির সুপারিশে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ১৬ মে ‘ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন এক্সিট সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা’ শিরোনামে একটি সার্কুলার জারি করা হয়। ওই সার্কুলারে যে কোনো অঙ্কের ঋণখেলাপিদের ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ড দিয়ে ১০ বছরের জন্য ঋণ নবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়। ওই সময় বলা হয়, আগ্রহীদের সার্কুলার জারির ৯০ দিনের মধ্যে এ সুবিধা পেতে আবেদন করতে হবে। কিন্তু উচ্চ আদালতে রিট করায় এটি কার্যকরের ওপর প্রথমে স্থগিত করা হয়। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত ৮ আগস্ট এক সার্কুলার দিয়ে বলা হয়, এ বিশেষ সুবিধা পেতে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন গ্রাহকরা। কিন্তু উচ্চ আদালতে আবার এ বিষয়ে রিট করায় গত মঙ্গলবার আবেদনের সময়সীমা ২০ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে প্রদত্ত আদেশ অনুযায়ী এ বিশেষ নীতিমালার আওতায় সুবিধাপ্রাপ্ত ঋণগ্রহীতাদের অনুকূলে কোনো নতুন ঋণসুবিধা প্রদান করা যাবে না।

গত মাসে বেসিক ব্যাংকের অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী বলেন, যারা ভুল স্বীকার ব্যাংকের টাকা ফেরত দেবে, তাদের ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হবে। তাদের নতুন করে ঋণ দেওয়া হবে। আমরা আদালত থেকে রায় নিয়ে আসব।

খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্দেশ্যে গণছাড় সুবিধা দেওয়ার আগেও ২০১৪ সাল থেকে বিশেষ ছাড়ে খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। গত ৫ বছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা নবায়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ১১টি বড় শিল্প গ্রুপ ১৫ হাজার কোটি টাকা বিশেষ ছাড়ে নবায়ন করে নেই। কিন্ত পরে ওইসব ঋণ আবার খেলাপি হয়ে যায়। ফলে গত বছরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৪ সারে খেলাপি ঋণ ছিল ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তা বেড়ে হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

10 + 2 =