Templates by BIGtheme NET
২ আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং , ১৭ মুহাররম, ১৪৪১ হিজরী
Home » অন্য পত্রিকার খবর » মশা মারার ওষুধ আছে, মানুষ নেই

মশা মারার ওষুধ আছে, মানুষ নেই

প্রকাশের সময়: আগস্ট ২৩, ২০১৯, ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ

আবুল কাশেম ও তোফাজ্জল হোসেন রুবেল: ডেঙ্গু রোগ থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় জরুরিভাবে ওষুধ আমদানির পর এবার জনবল ও স্প্রে মেশিনের সংকটে ভুগছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ থাকার পরও মেশিন ও স্প্রেম্যানের অভাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে লার্ভিসাইড স্প্রে করতে পারছে না করপোরেশন দুটি। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্কাউটসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে জনবল সরবরাহ করার পরও সিটি করপোরেশনভুক্ত পুরো এলাকায় লার্ভিসাইড স্প্রে করতে পারছে না তারা। এ অবস্থায় জরুরি ভিত্তিতে স্প্রেম্যান ও স্প্রে মেশিন চেয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুরোধ করছে করপোরেশন দুটি। তবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে স্প্রেম্যানরা দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজের জন্য ঢাকায় আসবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সিটি করপোরেশন দুটির চেয়ে জনবলে আরও করুণ অবস্থা মশক নিবারণী দপ্তরের। দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়, অর্থাৎ পুরো ঢাকা মহানগরের মশা মারতে তাদের মোট স্প্রেম্যান রয়েছেন ২৫৪ জন। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১২৮ ও উত্তর সিটি করপোরেশনে ১২৬ জন। এসব স্প্রেম্যান ঠিকমতো মশা মারার ওষুধ স্প্রে করছেন কি না, তা দেখভালের জন্য সুপারভাইজার রয়েছেন ৩২ জন।

জনবল সংকট মেটাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম জরুরি ভিত্তিতে ৫০০ স্প্রেম্যান ও স্প্রে মেশিন চেয়ে কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে দক্ষ স্প্রেম্যান ও স্প্রে মেশিন সংযুক্তি চেয়েছেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে পোকামাকড় দমনে এসব স্প্রেম্যান ও মেশিন ব্যবহার করে থাকে। গত সপ্তাহে জার্মানি থেকে ২০০ ফগার মেশিন আমদানি করলেও মেশিন চালানোর লোকের অভাবে ব্যবহার করতে পারছে না সেগুলোও।

গত ৮ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ২০০ স্প্রেম্যান ও ২০০ স্প্রে মেশিন চেয়েছেন ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম। তাতে তিনি লিখেছেনÑ ‘দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে স্প্রে মেশিন ও স্প্রেম্যানের সংকটের কারণে পর্যাপ্ত কীটনাশক মজুদ থাকা সত্ত্বেও ডিএনসিসির সমগ্র এলাকায় লার্ভিসাইড স্প্রে করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্তসংখ্যক স্প্রে মেশিন ও স্প্রেম্যান রয়েছে। জাতির এ সংকটময় মুহূর্তে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০০ স্প্রেম্যান ও ২০০ স্প্রে মেশিন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সংযুক্ত করা হলে ব্যাপক এলাকায় লার্ভিসাইড স্প্রে করা সম্ভব হবে। এর ফলে লার্ভা নিধনের মাধ্যমে এডিস মশার বংশবিস্তার অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০০ স্প্রেম্যানের কার্যক্রম তদারকির জন্য ২০ জন তদারকি কর্মকর্তাও আমাদের দরকার হবে।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়র আতিকের চিঠি পাওয়ার পর এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গতকাল বুধবার চিঠিটি সংশ্লিষ্ট ডেস্ক কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ চা বোর্ডের সচিব কুল প্রদীপ চাকমা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব স্প্রেম্যান রয়েছেন, তারা মূলত চা বাগানে স্প্রে করেন। তারা ঢাকা শহর ওইভাবে চেনেন না। তারা কতটা আগ্রহী হবেন, তা বলা যাচ্ছে না। তাই এখনই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’

ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তে মাত্র ২৫৪ জন দক্ষ স্প্রেম্যান আছে। আমাদের যে পরিমাণ মেশিন আছে, এই জনবল দিয়ে তা পুরোপুরি ব্যবহার করা যায় না। আবার নতুন করে জার্মানি থেকে ২০০ মেশিন কেনা হয়েছে। তাই চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ পাঁচটি দপ্তরে মোট ৫০০ স্প্রেম্যান চাওয়া হয়েছে। তারা তুলনামূলক দক্ষ বলেই আমরা চেয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘সংকটকালীন সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের প্রায় ১ হাজার ৬০০ জনবল অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার অনুমতি মিলেছে। এখন ওয়ার্ড পর্যায়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হবে।’

ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মশক নিধনের জনবল সংকট রয়েছে। যারা রয়েছেন, তারাও ঠিকমতো কাজ করছেন কি না মাঠপর্যায়ে তা তদারকি করার লোক নেই। ডিএনসিসিতে স্বাস্থ্য বিভাগ, কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা, ওয়ার্ড মেডিকেল অফিসার ও কীটতত্ত্ব পরিদর্শকসহ অনেক পদই শূন্য। মশার ওষুধ ছিটানোর যে জনবল আছেন, তাতে প্রতি ওয়ার্ডে ৪-৫ জন করে কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পর ডিএনসিসির চাহিদার পর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে ১ হাজার ৬২০ জন নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তারা প্রত্যেকে ৪৭৫ টাকা দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি পাবেন। ডিএনসিসিতে ৬০৯টি হ্যান্ডস্প্রে মেশিন, ৩২২টি ফগার মেশিন ও ১০টি হুইলব্যারো মেশিন রয়েছে। নতুন করে আরও ২০০ ফগার মেশিন আমদানি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মশা মারার মানুষের অভাব রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি)। মশার ওষুধ ছিটানোর জন্য তাদের ৪৫৪ জন স্থায়ী জনবল রয়েছেন। নতুন করে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে প্রতি ওয়ার্ডে ৩০ জন করে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ সিটি করপোরেশনের মশার ওষুধ ছিটানোর ৯৪০টি মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে হস্তচালিত মেশিন ৪৪২, ফগার ৪৪৭ ও ৫১টি হুইলব্যারো রয়েছে। ৪৪২টি হস্তচালিত মেশিনের মধ্যে ২০৮টি ও ৪৪৭টি ফগারের মধ্যে ১৮৬টি প্রায় অচল। আর ৫১টি হুইলব্যারোর মধ্যে ১৮টিই প্রায় অকেজো।

তারা জানান, যে পরিমাণ মেশিন সিটি করপোরেশনের রয়েছে, সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত দক্ষ লোক নেই। ডিএসসিসির বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম দেখভালের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ৭৫ জন কর্মকর্তাকে ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ সেল’ গঠনের মাধ্যমে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গত ৫ আগস্ট ডিএসসিসিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় জনবল সংকটের কথা বলা হলেও নতুন করে কোনো জনবল নিয়োগ করা হয়নি।

ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘ডিএসসিসির মশক নিধনের কাজে যে জনবল রয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। ডিএসসিসির আয়তন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সেই তুলনায় জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন সংগঠন, স্কাউট, বিএনসিসি, ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সের সদস্যদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে জনবল নিযুক্ত করা হয়েছে।’

ডিএসসিসিতে দীর্ঘ সময় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সরকারের অতিরিক্ত সচিব খান মোহাম্মদ বিলাল। তিনি গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মশার ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। আমাদের কোনো সমস্যা দেখা দিলে তখন তা নিয়ে অতি ব্যস্ত হতে দেখা যায়। সংকট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মশক নিধনের বিষয়টিও খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। এখন সময় এসেছে এ বিষয়ে পরিকল্পনা নিয়ে বছরব্যাপী কাজ করার। এখানে সিটি করপোরেশনের যেমন দক্ষ জনবল ও মনিটরিং বাড়াতে হবে, সেই সঙ্গে মশার উৎপত্তিস্থলের ধ্বংসের বিষয়ে জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (সিটি করপোরেশন) সোহরাব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের সব সিটি করপোরেশনকে তাৎক্ষণিক অর্থ বরাদ্দ দিয়েছি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে দৈনিক ভিত্তিতে ৩০ জন করে শ্রমিক নিয়োগের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, এ জনবলের কাজের মাধ্যমে মশক নিধনে সুফল বয়ে আসবে। ডিএনসিসি সরকারের কয়েকটি দপ্তরের যে দক্ষ জনবল চেয়েছে, তা পেলে আরও ইতিবাচক হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

eight − six =