Templates by BIGtheme NET
১১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ২৩ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
Home » মতামত » হতে পারে অভিশাপ
অবৈধ আয়ের টাকায় বড় গরু

হতে পারে অভিশাপ
অবৈধ আয়ের টাকায় বড় গরু

প্রকাশের সময়: আগস্ট ৮, ২০১৯, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ: আপনার টাকা আছে। দামি পশু কিনলেন। ঘটা করে জবাই করলেন। কোরবানির মাংসও বিতরণ করলেন গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়দের মাঝে। এতেই কি হয়ে গেল কোরবানি? শুদ্ধভাবে কোরবানি দিতে হলে হালাল অর্থ, হালাল পশু, হালাল পদ্ধতিতে জবাই ও বিধান মেনে বণ্টন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর যেকোনো পর্যায়ে ব্যত্যয় ঘটলেই আর সেটা কোরবানির সঠিক তাৎপর্য বহন করে কি না ভেবে দেখার বিষয়।

ভেবে দেখুন তো, আপনি যে টাকায় কোরবানির পশু কিনেছেন সে অর্থের উৎস হালাল কিনা? ঘুষ, দুর্নীতি করে মানুষ ঠকিয়ে অবৈধ পথে যদি কেউ টাকা কামাই করেন, সেই টাকায় যত বড় গরুই কিনেন না কেন, তাতে আছে ওইসব প্রতারিত মানুষের অভিশাপ। কারও কান্নার জলে অভিশাপে গড়া আপনার সম্পদ বা টাকায় যে পশু কিনেন, তা কি হালাল হতে পারে? ইসলাম কি বলে ওই অর্থ হালাল? হারাম উপার্জন খেয়ে গড়া রক্ত-মাংসে হারাম, চিন্তায় হারাম, কাজে হারাম, অর্থে হারাম। আর বাজারে গিয়ে পশুর বয়স, দাঁত, শিং দেখে খুঁজে আনলেন তরতাজা হালাল পশু। এতেই কি সব শুদ্ধ হয়ে যাবে? উৎসে হারাম। আর প্রান্তে এসে তা হয়ে যাবে হালাল?

এই যে আমরা পশু কেনার প্রতিযোগিতায় নামি। কে কত বড় কত দামি গরু কিনলাম তার প্রচারে নামি এর মধ্যে কি একটা দাম্ভিকতা প্রকাশ পায় না? কোরবানির গরু কিনে হারজিত হিসাব করাটা কি খুবই জরুরি? আল্লাহর নামে কোরবানি দেব। বাজারদর অনুযায়ী সামর্থ্য বুঝে একটা হালাল পশু কিনলেই তো হলো। তা নিয়ে জিতেছি বা ঠকেছি চিন্তায় হয়রান হয়ে লাভ কি!

এই কোরবানির মধ্যেও আছে রাজনীতি। অনেক রাজনৈতিক নেতাকেই দেখা যায় সারা বছর এলাকায় যাওয়ার নাম গন্ধ নেই, এলাকাবাসীর ভালো মন্দ দেখভালের বেলায় উদাসীন। এলাকার মানুষের জন্য বরাদ্দ পাওয়া সরকারি অর্থ লোপাট করে, জনগণের টাকা মেরে সেই টাকায় অনেক সংখ্যক গরু কিনে কোরবানি দেন। এলাকার মানুষের মধ্যে মাংস বিতরণ করেন। উদ্দেশ্য থাকে নাম ছড়িয়ে নেতা বনে যাওয়া। এটাকে কি কোরবানি বলা চলে? আল্লাহর নামে সৎভাবে উৎসর্গ করার চেয়েও যেখানে ধান্দা থাকে অন্য কিছু প্রাপ্তির, তা কি আর কোরবানি হয়!

গত কয়েক বছর ধরে কোরবানি আসলেই শুরু হয় আরেক কারবার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক তখন আর ফেইসবুক থাকে না। হয়ে ওঠে ‘গরুবুক’। সবাই যেভাবে গরুর ছবি দিতে থাকে তা এক রকম বাড়াবাড়ির পর্যায়েই চলে যায়। আবার এটা নিয়ে নাক সিঁটকানো গ্রুপের লোক দেখানো সেকুলার সাজার প্রবণতায়ও থাকে বাড়াবাড়ি। আপনার পোষা পাখি, বিড়াল, কুকুরের ছবি ফেইসবুকে দেওয়াটা যদি শুদ্ধ হয়, তাহলে একজন যদি তার গরুর সুন্দর দুয়েকটা ছবি দিতেই চান তাতে দোষের কী আছে!

তবে আপত্তিটা হতে পারে অন্য জায়গায়। অনেকেই জবাইকৃত গরু-ছাগলের রক্তাক্ত ছবি পোস্ট করেন ফেইসবুকে। যারা এটা করেন তাদের মনে রাখা দরকার, এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিতে সব ধর্মের-বর্ণের-বয়সের মানুষের বিচরণ। এই রক্তাক্ত পশুর ছবি, মাংস এগুলো অনেকেরই ভালো লাগে না। এগুলো ফেইসবুকে দিয়ে না লাভ হয় যারা দেন তাদের, না লাভ হয় ধর্মের। এই রকম একটা অপ্রয়োজনীয় উপাদান পাবলিক করে অন্যের বিরক্তি তৈরির মাধ্যমে অর্জনটা কী? ধর্ম তো কারও মনে আঘাত দিতে, কাউকে বিরক্ত করতে শেখায় না।

আরেকটা বিষয়ও মাথায় রাখাটা জরুরি। সেটা হলো কোরবানির পরে কোরবানির পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। জবাইকৃত পশুর বর্জ্য পরিষ্কার করা সবারই দায়িত্ব। এই সব বর্জ্য থেকে পানিবাহিত ও বায়ুবাহিত রোগ ছড়াতে পারে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে কোরবানি, তা থেকে যদি মানুষের অকল্যাণ হয়, মানুষ কষ্ট পায় তবে তাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন কি না সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

এ বছর কোরবানির সময় দেশের অনেক অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা চলছে। গণপিটুনিতে হত্যা, গুজব, আর ডেঙ্গু-গজবের কারণে বন্যা খুব একটা আলোচনায় না এলেও দেশের অনেক এলাকায় চলছে ভয়াবহ বন্যা। জানমালের ক্ষতিও হয়েছে অনেক। বন্যার কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বেশ কিছু। সে কারণে বন্যাদুর্গত এলাকায় কোরবানির গরু জবাইয়ের মতো উঁচু শুকনো জায়গাও সীমিত। সেখানে কোরবানির পরে পশুর বর্জ্য পানিতে ফেললে তা ব্যাপকভাবে রোগ ছড়াতে পারে। এমনিতেই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সময় পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় একসঙ্গে অনেকগুলো জবাইকৃত পশুর বর্জ্য তবে পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ হতে পারে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শহর অঞ্চলে সিটি করপোরেশন বা পৌর কর্তৃপক্ষ পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ভূমিকা রাখলেও গ্রামাঞ্চলে এ কাজটি যারা কোরবানি দেবেন তাদেরই করতে হয়। তাই সবাই যদি নিজ উদ্যোগে কোরবানির পরে জবাইকৃত পশুর বর্জ্য এখানে সেখানে বিশেষ করে পানিতে না ফেলে মাটিতে পুঁতে রাখেন তাতে সবারই কল্যাণ।

শুধু রোগ প্রতিরোধের জন্যই নয়, মানুষকে বিরক্তিকর কষ্ট থেকে রক্ষা করতেও কোরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে। শহর অঞ্চলে সকলেরই হয়তো একটা অভিজ্ঞতা আছে। তা হলো, কোরবানির পরে রাস্তায় নামলে উৎকট বাজে গন্ধ। হাড়-মাংসের অপ্রয়োজনীয় টুকরো, পা-মাথা, রক্ত বা পশুর নাড়িভুঁড়ি বাসার সামনে, রাস্তায় বা ড্রেনে ফেলে রাখলে তা থেকে যে উৎকট গন্ধ বের হয় তা সহ্য করা কঠিন। বিশেষ করে যখন রোদ-গরম থাকে চরমে তখন দুর্গন্ধটাও হয় বেশি। ভেবে দেখুন, যারা কোরবানি দেন, গরুর মাংস কাটতে-রান্না করতে-খেতে অভ্যস্ত তাদের কাছেই যে গন্ধ অসহ্য। সেখানে যাদের এ অভ্যস্ততা নেই তাদের কাছে কেমন লাগতে পারে?

তাই এক্ষেত্রেও সবার মনে রাখা দরকার, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি যেন আমরা মানুষের অসন্তুষ্টি তৈরি না করি। কোরবানির পরে পশুর সমস্ত বর্জ্য যত দ্রুত সম্ভব অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। তারপর গরু জবাইয়ের ও মাংস কাটা জায়গাগুলো ভালো করে ধুয়ে তাতে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

বন্যার বাইরেও এবারের কোরবানির ঈদে আরেকটা উৎকণ্ঠা তাড়িত করবে মানুষকে। তা হলো ডেঙ্গুজ্বর। ইতিমধ্যে মহামারী আকার ধারণ করা ডেঙ্গু সবার আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় শুরু হলেও তা ইতিমধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ঈদের ছুটিতে যে অসংখ্য মানুষ নাড়ির টানে বাড়ির পানে ছুটে যাবেন তাদের অনেকেই হয়তো রক্তে বহন করে নিয়ে যাবেন ডেঙ্গুজ্বরের ভাইরাস। আর এই ঈদে শুধু মানুষই ট্রাভেল করবে না, ওই গাড়িতে লঞ্চে ট্রেনে বিনা ভাড়ায় সওয়ার হবে কিছু ডেঙ্গু মশাও। ফলে এই কোরবানির ঈদে সারা দেশে ডেঙ্গু আরও বিস্তৃত হয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ঢাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বড় হলেও এখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত। কিন্তু ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় না আছে ভালো মানের হাসপাতাল-চিকিৎসক, না আছে সবার চিকিৎসা নেওয়ার আর্থিক সংগতি। ফলে ঢাকার বাইরে যদি ডেঙ্গু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা বড় ধরনের বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রেও সবার সতর্কতা জরুরি। ডেঙ্গু মশার উৎসস্থল বিশেষ করে যে সব স্থানে মোটামুটি পরিষ্কার পানি জমে থাকতে পারে তা যেন গ্রামেও পরিষ্কার করা হয় তা সবার খেয়াল রাখা উচিত। যারা ঈদের আনন্দ পরিবার পরিজনের সঙ্গে শেয়ার করতে গ্রামের বাড়ি গেছেন, তাদের যতটা সম্ভব সতর্ক থাকতে হবে যাতে ঈদের আনন্দ ডেঙ্গুর কবলে পড়ে নিরানন্দে পর্যবসিত না হয়। আর আনন্দের অংশীদার করতে গিয়ে গ্রামে থাকা পরিবার পরিজনকে যেন আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে না দিই সে দিকটাও খেয়াল রাখা দরকার। আর সামর্থ্যবান মানুষ যারা কোরবানি দিচ্ছেন, তারা বন্যাকবলিত ও ডেঙ্গু আক্রান্ত অসচ্ছলদের সাহায্য করলে তা কোরবানির মহিমাকে আরও উজ্জ্বলতর করবে নিঃসন্দেহে।

কোরবানি দেওয়ার মাধ্যমে যারা প্রযোজ্য ওয়াজিব (কারও কারও মতে, সুন্নতে মুয়াক্কাদা) আদায় করছি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি আদায়ের চেষ্টা করছি সত্য। তবে কোরবানির মূল মর্মবাণী হলো বিসর্জনের মাধ্যমে অর্জন। যা কিছু পঙ্কিলতাযুক্ত যা কিছু অকল্যাণকর তা বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর নামে পশু কোরবানি দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আসল কথা।

ভেবে দেখার বিষয়, আমরা আসলে কী কোরবানি দিই। এই যে প্রতি বছর উৎসব করে পশু কিনি, জবাই করি, মাংস বিতরণ করি এতে আসলে কী অর্জন করলাম? শুধু একটা পশু জবাই করাই কি কোরবানি? আমরা আমাদের কুপ্রবৃত্তিগুলোকে কি কোরবানি দিতে পারছি? নিজের মনের কাছেই একবার জিজ্ঞেস করুন তো। তারপর সৎভাবে উত্তরটা নিজেই দিন। কোরবানির মাধ্যমে কি আমাদের মনের ভেতরে জমে থাকা হিংসা, বিদ্বেষ, জিঘাংসা, অসৎ চিন্তা একটুও কমেছে? আমাদের মনের ভেতরে জেঁকে বসা পশুত্বটাকে কি কোরবানি দিতে পেরেছি? যা কিছু অর্জনের আশায় কোরবানির আনুষ্ঠানিকতা করলাম, তার কতটুকুই বা অর্জন হলো আমাদের? নাকি শুধু পশু বিসর্জন দিয়েই সারলাম কোরবানির দায়িত্ব? লেখক

চিকিৎসক ও কলামনিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

seven + seven =