Templates by BIGtheme NET
১১ ভাদ্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৬ আগস্ট, ২০১৯ ইং , ২৩ জিলহজ্জ, ১৪৪০ হিজরী
Home » মতামত » ধর্ষণ রোধে সব প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত সেল প্রয়োজন

ধর্ষণ রোধে সব প্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত সেল প্রয়োজন

প্রকাশের সময়: আগস্ট ৭, ২০১৯, ৮:৪৩ অপরাহ্ণ

সজীব সরকার :

অর্থনীতির নানা সূচকে আমরা দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু অর্থনীতির বাইরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক যে বলয় আমাদের জীবনের জন্যে অপরিহার্য, তাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি সাধিত হচ্ছে না। ফলে সাধারণভাবে মানুষের জীবনের মান বা ‘কোয়ালিটি অব লাইফ’ উন্নত হচ্ছে, এমনটি বলা যায় না।

নিরাপদ ও নিশ্চিত জীবন উন্নত জীবন-মানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু আমরা দেখছি, আমাদের সমাজে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নানাভাবে আক্রান্ত। শিশু ও নারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। শিশুরা ঘরে-বাইরে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দ্বারাও নানা নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হচ্ছে। নারীরা কর্মক্ষেত্রে বা গণপরিবহনে কিংবা সড়কে তো নিশ্চিত ও নিরাপদ নয়ই, এমনকী নিজের ঘরেও নিরাপদ নয়। আর এই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বরাতে ৮ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের (২০১৯) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬ মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর এক ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে।

ওই প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়েছে, অন্তত ৪৯টি শিশু (৪৭ জন মেয়ে ও ২ জন ছেলে) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ওই সংস্থা দাবি করেছে, ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল যার মধ্যে মারা গিয়েছিল ২২ জন এবং আহত হয়েছিল ৩৩৪ জন। এই পরিসংখ্যান কতটা উদ্বেগজনক, তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না।

শিক্ষার্থীর জীবনে শিক্ষকের অবদান হতে পারে এককথায় অসীম। এজন্যই একজন ব্যক্তির জীবনে বাবা-মায়ের পর শিক্ষকদের স্থান দেওয়া হয়। একজন শিক্ষকের আন্তরিক প্রচেষ্টা একজন শিক্ষার্থীর জীবন গড়ে দিতে পারে। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি, শিক্ষকের দ্বারা শিক্ষার্থীরা যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একজন শিক্ষার্থীর বিদ্যার্জনের পুণ্যতীর্থ ও নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা, সেটি শিক্ষার্থীদের জন্যে আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে।

স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-মাদ্রাসা-কোচিং সেন্টারসহ বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষায়িত একটি সেল গঠন করা দরকার যেটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন রোধে কাজ করবে। এই সেল কেবল নিপীড়নের পর কাউন্সেলিং বা বিচারের ব্যবস্থাই করবে না, এ ধরনের ঘটনা যেন কখনোই না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। সরকারি আদেশে এই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্যে অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে যেখানে নিরাপদে ও স্বস্তিতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জন করবে। শিক্ষকদের শিক্ষার্থীর শুভসাধক হয়ে উঠতে হবে, ক্ষতিকারক নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো দেশের অন্য সব প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দিচ্ছি। পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনকেও যথাযথ উপায়ে নিরাপত্তার আওতায় আনা দরকার। বিশেষ করে বাসের মতো গণপরিবহনগুলোকে প্রাথমিকভাবে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা যেতে পারে। তবে কেবল এসব উদ্যোগ এ ধরনের নিপীড়ন ঠেকাতে শতভাগ সফল হবে, অবশ্যই তা নিশ্চিত করে বলা যায় না; এজন্যে সব মানুষের মধ্যে নৈতিক বোধ জাগ্রত করতে হবে এবং সচেতন হতে হবে। এর পাশাপাশি এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সামাজিকীকরণের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেননা এখানে শিক্ষার্থীরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ গ্রহণ করে। তাই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকে নিরুৎসাহিত করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এমন পাঠের অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যসূচির অনেক পাঠে ভুল বা নেতিবাচক জেন্ডার ধারণার প্রতিফলন চোখে পড়ে; সেগুলো পরিবর্তন করা দরকার। পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালিত করা দরকার যেখানে নৈতিকতার পাঠ কেবল বইয়ের পাতা থেকে পড়ানোর মধ্যে সীমিত না রেখে শিক্ষার্থীদের জীবনে সেই নৈতিকতার চর্চাকে উৎসাহিত করা হবে।

আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বার্ট্রান্ড রাসেলের মতো মনীষীরা যুগে যুগেই পাঠক্রমে নৈতিক শিক্ষার ওপর জোর দিতে সুপারিশ করেছেন।

এজন্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিবারগুলোকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। পরিবার আসলে মানুষের প্রথম কেবল নয়, সবচাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র। পরিবারে নৈতিকতার চর্চা না থাকলে শিশুদের মধ্যেও নৈতিকতার চর্চা নিশ্চিত করা যাবে না।

নানাবিধ গবেষণা বলে, একজন ব্যক্তির সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবারের গুরুত্ব খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা জন্মের পর জীবনের প্রথম পাঠ সে পরিবারেই পায়। পরিবারের বড় সদস্যদের অনুকরণের মধ্য দিয়েই একটি শিশুর ব্যক্তিত্বের বিকাশ শুরু হয়। সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান অসমতার ও অশ্রদ্ধার সম্পর্ক নারীর প্রতি সহিংসতার একটি বড় কারণ।

পুরুষ নারীর ‘প্রভু’ নয়, নারীর ‘সহচর’ – পরিবারের মধ্যেই এই শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ছেলেরা ‘নিপীড়ক’ নয় বরং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহমর্মী এবং নারীর বিশ্বস্ত শুভচিন্তক হিসেবে বেড়ে উঠবে। তাই পরিবারকেই হতে হবে ব্যক্তির নৈতিক শিক্ষার সূতিকাগার।

সজীব সরকার: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, সেন্ট্রালল উইমেন’স ইউনিভার্সিটি। লেখক ও গবেষক।

[email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

1 × two =