Templates by BIGtheme NET
৫ শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২০ জুলাই, ২০১৯ ইং , ১৬ জিলক্বদ, ১৪৪০ হিজরী
Home » মতামত » চোখের পানিতে শেষ হলো ‘ফিনিশারে’র বিশ্বকাপ

চোখের পানিতে শেষ হলো ‘ফিনিশারে’র বিশ্বকাপ

প্রকাশের সময়: জুলাই ১১, ২০১৯, ৯:৪৮ অপরাহ্ণ

ইন্ডিয়ান্স এক্সপ্রেসের শিরোনামটা ঠিক এ রকম, ‘এমএস ধোনি : আন-ফিনিশার।’ মাত্র একদিনের ব্যবধানে গ্রেট ফিনিশার থেকে ধোনি হয়ে গেলেন ‘আন-ফিনিশার’! নিউজিল্যান্ডের কাছে সেমিফাইনালে হারের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, ধোনির চোখে পানি। পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যাকে কখনও কোনো কিছুতেই আবেগ-অনুভুতি প্রকাশ করতে দেখা যায়নি, তিনিই কি না বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের শেষটা করলেন চোখের পানিতে! বিদায়টা কত করুণ হয়!!

মহেন্দ্র সিং ধোনি। এই নামটা যেন ক্রিকেটের এক অবাক বিস্ময়। অধিনায়ক কিংবা ব্যাটসম্যান- সর্বদাই তিনি থাকেন একেবারে নির্লিপ্ত। ভাবলেশহীনভাবেই ম্যাচ জিতিয়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে আসেন। দুটি বিশ্বকাপ জিতেছেন, অনেক অর্জন তার ঝুলিতে; কিন্তু কোনোকিছুই যেন কোনোদিন তাকে ছুঁয়ে যায়নি। কোনো ভাবাবেগের আশ-পাশেও ছিলেন না। কেউ কেউ বলতেন, দ্য কুল। অনেকেই বলতেন, ধোনি যেন রোবট। যার মধ্যে আবেগ-অনুভুতির কোনো হরমোনই হয়তো ছিল না।

পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে ভারতীয় ক্রিকেট দলের জন্য পালন করেছেন গ্রেট ফিনিশারের ভূমিকা। কখনও কখনও ব্যাট হাতে হয়ে উঠেন দলের ত্রাতা। শেষ মুহূর্তে যখন চারদিক উত্তেজনায় ঠাসা, তখন তিনি এমনভাবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে ম্যাচ শেষ করে আসতেন, যেন মাথায় বরফের ব্যাগ বেধে সেটাকে কঠিন মুহূর্তে ঠাণ্ডা রেখেছিলেন। তাকে মনে রাখার মতো অসংখ্য কীর্তি উপহার দিয়েছেন ধোনি। অধিনায়ক হিসেবে (আন্তর্জাতিক কিংবা ঘরোয়া ক্রিকেট, সব জায়গাতেই) সম্ভাব্য প্রায় সব শিরোপাই জিতেছেন।

ধোনির ক্যারিয়ারের শুরু ২০০৪ সালে। বাংলাদেশের বিপক্ষে। চট্রগ্রামে নিজের প্রথম রানটি করার আগেই তাপস বৈশ্যের থ্রোতে ফিরে যেতে হয়েছিল রান আউটে কাটা পড়ে। সুতরাং, ক্যারিয়ারের শুরুটা হলো ডাক মেরে। কিন্তু সব সময়ই ‘মর্নিং সোজ দ্য ডে’ কিন্তু সত্যি হয় না। ধোনির ক্ষেত্রেও তাই হয়নি।

এরপর তিনি জন্ম দিয়ে গেছেন একের পর এক রূপকথা। ২০১১ বিশ্বকাপের ফাইনালে এক অতিমানবীয় ইনিংস খেলে হয়েছিলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার। সেই ইনিংসের ওপর ভর করেই এবং তার নেতৃত্বে ২৮ বছর পর ভারতকে দ্বিতীয়বারেরমত জেতান বিশ্বকাপ শিরোপা।

সময় যত গড়ায়, ততই সব কিছু পুরনো হতে থাকে। ধার কমে যায়। অ্যাথলেটদের ক্ষেত্রে তো এটা আরও বেশি সত্যি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের সেই ধার থাকার কথা নয়। সুতরাং, আগের সেই ধোনি এখন আর নেই। ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে। বিশ্বকাপ চলাকালেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, বিশ্বকাপের পরই হয়তো ব্যাট-প্যাড-গ্লাভস তুলে রাখার ঘোষণা দেবেন তিনি। তবে নিশ্চিত, এটাই তার বিদায়ী বিশ্বকাপ। বিশ্বমঞ্চে আর কখনও দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা যাবে না বিশ্বকাপ জয়ী ভারত অধিনায়ককে।

ক্যারিয়ারের শুরুর মতোই হলো তার বিশ্বকাপের শেষটাও। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন মুহূর্তে পুরো ভারতবর্ষ তাকিয়ে ছিল তার ব্যাটের দিকে। ৪৯তম ওভারের প্রথম বলেই লকি ফার্গুসনকে যেভাবে ছক্কা মেরেছিলেন, তাতে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের মতো উঠে দাঁড়িয়েছিল পুরো ভারতও। সলতের মাথায় নিভু নিভু হয়ে জ্বলতে থাকা আগুনটা যেন হঠাৎই ছলকে উঠেছিল।

কিন্তু বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে শেষ ম্যাচটায় আর গ্রেট ফিনিশারের ভুমিকা নিতে পারেননি। ইনিংসের শেষের ৯ বল আগে মার্টিন গাপটিলের সরাসরি থ্রোতে রান আউটে কাটা পড়েন তিনি। যেমনটা ঘটেছিলো ১৫ বছর আগে। সেবার তাপস বৈশ্য আর এবার গাপটিল। ধোনির আউট হওয়ার আগ পর্যন্তও ভারতীয়দের বিশ্বাস ছিলো নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে যাবে তারা।

কিন্তু ধোনির আউটের পর শেষ পর্যন্ত ১৮ রানে হেরে যায় ভারত। ব্যর্থ হয় ফাইনালে উঠতে। দলকে ফাইনালে তুলতে না পারার ব্যর্থতায় সারাজীবন আবেগ লুকিয়ে রাখা ধোনিও তাই আটকে রাখতে পারেননি নিজের চোখকে। মাঠ থেকে বের হওয়ার সময়ই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে জল।

আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে রান তাড়া করতে এসে মোট ৫০ বার অপরাজিত ছিলেন ধোনি। যাতে তিনি করেছেন ২১৮৪ রান। ২ সেঞ্চুরির সঙ্গে পেয়েছেন ১৬ ফিফটির দেখা। গড়? ৯১.০৩! এই ৫০ বার অপরাজিত থেকে রান তাড়া করতে নেমে ৪৭ বারই সফল হয়েছেন, ২ বার হেরেছেন আর ১বার ম্যাচ হয়েছে টাই।

ক্যারিয়ারে পুরো সময়টা জুড়ে যে ফিনিশিংয়ে অবিশ্বাস্য ছিলেন ধোনি, তাকে বিশ্বকাপের শেষটা করতে হলো ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতা দিয়ে। আন-ফিনিশার ট্যাগটা তাই পুরোপুরিভাবেই লেগে থাকবে তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে? গোধূলি বেলায় যখন তাকে দলের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অপরাজিত থাকার, তখনই হলেন ব্যর্থ। তাও রান- আউটে। অথচ রান নেওয়ার ক্ষমতার জন্য সারাজীবনই শুনেছেন প্রশংসার স্তুতি। তাই বলাই যায়, কান্নায় শেষ হলো ‘ফিনিশারের’ বিশ্বকাপ।

লেখক : মাহমুদুল হাসান বাপ্পি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

twenty − eight =