Templates by BIGtheme NET
১২ আষাঢ়, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৬ জুন, ২০১৯ ইং , ২২ শাওয়াল, ১৪৪০ হিজরী
Home » জাতীয় » রাজনীতিতে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে

রাজনীতিতে সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে

প্রকাশের সময়: মে ২৪, ২০১৯, ৫:৪৪ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনীতিতে চরম ভারসাম্যহীনতা ও সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। চলমান সংকট মোকাবেলায় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন, নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা, নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিরপেক্ষতা নিশ্চিতসহ ১৮ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠনটি। এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত, আর্থিক খাতে সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয় প্রস্তাবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কার ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধে এসব সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। গত কয়েক মাসে সুজনের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১১টি আলোচনা সভায় উঠে আসা সুপারিশ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকদের মতামতের ভিত্তিতে এ ১৮ দফা প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে বলে দিলীপ জানান। এসব প্রস্তাবের আলোকে জাতীয় সনদ তৈরি করারও দাবি জানান তিনি।

সুজন সভাপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজনের নির্বাহী সদস্য সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রমুখ। মূল প্রবন্ধে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, মানব সেবার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দেশে অর্জিত হতে হবে গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন। আর এজন্য প্রয়োজন আদর্শভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি। এক সময় দেশে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চা হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই তা অপরাজনীতি ও দুর্বৃত্তায়নের শিকার। কিন্তু জনকল্যাণমুখী রাজনীতি ফিরিয়ে আনার জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই, যার জন্যও প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার।

নির্বাচনী সংস্কারের প্রস্তাব দিয়ে মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনটি ছিল একতরফা ও বিতর্কিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে ব্যাপক কারচুপি ও মানুষের ভোটাধিকার হরণের। তাই গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে নির্বাচনকালীন সরকার নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি। নির্বাচন ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত ও পরিশুদ্ধ করতে এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইন সংশোধন ও নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

এছাড়া আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আইনি সংস্কার, ঋণখেলাপিসহ লুটপাটকারীদের পৃষ্ঠপোষকতার পরিবর্তে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত এবং ব্যাংকিং খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতা ও নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছে সুজন।

সভাপতির বক্তব্যে এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, চোখের সামনে দেখলাম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ধ্বংস হয়ে গেল। তাই রাষ্ট্রের মেরামত জরুরি। এজন্য মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে। কিন্তু গত নির্বাচনের পর মানুষকে রাস্তায় নামতে দেখলাম না, এটা আশ্চর্যের। তিনি আরও বলেন, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেশে যে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আবারও প্রমাণিত হয়েছে। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো কিছু একটা বের করতে হবে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আইনকানুন সঠিকভাবে কাজ করলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এখন দেখা দরকার, আইনকানুন সঠিকভাবে প্রণয়ন হচ্ছে কিনা, প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর কিনা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে কিনা। তিনি বলেন, শাসনব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশ অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হবে। তাই আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব সংশোধন করে সারা দেশে জনমত তৈরি করা হবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আগের রাতে কেউ ভোট না দিতে পারে সেজন্য ভোট সকাল ৯টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হওয়া দরকার এবং ভোটের দিন সকালেই ব্যালট বক্স কেন্দ্রে পাঠানো দরকার। তিনি বলেন, উদার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আমরা ক্রমেই সঙ্কুচিত করে ফেলছি। এর ফলে সংক্রামকের মতো উগ্রবাদের উত্থান ঘটতে পারে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে করায়ত্ত করে ফেলা হচ্ছে।

ড. হামিদা হোসেন বলেন, আইয়ুব খানের সময়েও আমরা অনেকটা স্বাধীনভাবে লিখেছি, এরশাদের সময়ে আমরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছি। অথচ আজকে আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথাও স্পষ্ট করে বলতে পারি না, নানা ধরনের চাপের মধ্যে থাকতে হয়। আজকে নির্বাচনের ওপর আমরা অনেক জোর দিচ্ছি। অথচ আমাদের দলগুলোর মধ্যেই গণতন্ত্র নেই। আর দলের মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলে সংসদে কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, কোনো ধরনের বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করা যাচ্ছে না। দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জনগণের মূল্যায়ন কমে গেছে। কিন্তু জনগণের মধ্যে অসন্তোষ থাকলে কোনো উন্নয়ন টেকসই হবে না। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য হারিয়ে যাচ্ছে। সুদক্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না। জনগণকে ক্ষমতাহীন করে ফেলা হয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে জনগণকে ক্ষমতায়িত করে তুলতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ড. সিআর আবরার বলেন, মানুষের অধিকারগুলো সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, মানুষ গুম-খুনের শিকার হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ভোটাধিকার নির্বাসন কমিশনে পরিণত হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নানা ধরনের চাপে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আজ শুধু জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। অবাক করা বিষয় হল, আজকে এসবের প্রতিবাদও দেখছি না।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকী, সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী রুমিন ফারহানা, নাগরিক ঐক্যের কেন্দ্রীয় সদস্য জাহেদ উর রহমান, সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুল্লাহ আল ক্বাফি রতন প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

two × four =