Templates by BIGtheme NET
৫ কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ইং , ১৯ সফর, ১৪৪১ হিজরী
Home » মতামত » ভালোবেসে যদি ভুল হয়ে যায়

ভালোবেসে যদি ভুল হয়ে যায়

প্রকাশের সময়: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯, ৩:৪৮ পূর্বাহ্ণ

শীতের শেষে মন মাতানো দখিনা হাওয়া আর বাগানজুড়ে ফুল যেন বলছে, ‘বসন্ত এসে গেছে’। পহেলা ফাল্গুন আর ভালোবাসা দিবস—পাশাপাশি দুটি দিন ভালোবাসায় ভরে থাকে বাংলাদেশ, বিশেষ করে ঢাকা আর সবিশেষভাবে বইমেলা। বসন্ত, ভালোবাসা আর তারুণ্য মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ভালোবাসার মানুষটির হাতে গোলাপ তুলে দিয়ে মধুর স্বরে উচ্চারিত হয় ‘ভালোবাসি’। সত্যি কি এত সহজ ভালোবাসা? ভালোবাসা বলা হয়তো খুবই সহজ, কিন্তু ভালোবাসার প্রমাণ দিতে হয় সারা জীবন ধরে। আবার আজকের ভালোবাসার প্রমত্তা নদী কাল শুকিয়ে হয়ে যায় শুকনো মরা নদীখাত, যা শুধু চিহ্ন রেখে যায় হৃদয়ে।

রাধা-কৃষ্ণ, হেলেন-প্যারিস, ত্রিস্তান-ইসল্ট, লায়লা-মজনু, হীর-রাঞ্জা, রোমিও-জুলিয়েটের মতো অসংখ্য প্রেমিক জুটির কাহিনি ইতিহাস, পুরাণ, সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। আবার প্রতারণাকে প্রেম বলে ভুল করে কত মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে চিরতরে।

ভালোবাসা মানুষের বড় অর্জন। সেটার বিপক্ষে বলার কিছুই নেই। দিবসের নামে ভালোবাসার বাণিজ্যিকীকরণের পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কথা বলা চলে। সেগুলো নিয়েও কিছু বলব না। আজ আমি শুধু দুটি ঘটনা উল্লেখ করব। দুটিই শতভাগ সত্য। প্রথম ঘটনাটি ১৯২০-এর দশকে। কলকাতা শহর। এই শহরে এক ধনী মুসলমানের বাড়িতে জায়গির থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত এক সুদর্শন তরুণ। সেই বাড়ির গৃহকর্তার ১৪ বছরের সুন্দরী মেয়েটি তাকে ভালোবাসে। তরুণও। দুজনে মনে মনে স্বপ্নজাল বোনে। তাদের বিয়েও মোটামুটি ঠিকঠাক হয়ে যায়। কিন্তু আচমকা দুই পরিবারের মধ্যে সামান্য কারণে বাগিবতণ্ডা হয়ে ভেঙে যায় বিয়ে। ছেলেটি বাড়ি থেকে বিতাড়িত। মেয়ের বাবা এক সপ্তাহের মধ্যে অন্যত্র বিয়ে দেন কন্যার। পেশায় দেশজুড়ে খ্যাতি পেলেও ছেলেটি অবিবাহিত ছিল সারা জীবন। মেয়েটি কখনো সুখী হতে পারেনি দাম্পত্যে। তারপর ৭০ বছর বয়সে সেই প্রেমিকের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে মৃত্যু হয় বৃদ্ধার। মৃত্যুর মধ্য দিয়েই হয়তো মিলিত হয় তারা।

দ্বিতীয় ঘটনাটি বিশ শতকের আশির দশকের ঢাকা। খালার বাসায় থেকে লেখাপড়া করে এক তরুণ। খালাতো বোনের সঙ্গে প্রেমও। কিন্তু মেয়েটির বাবা দরিদ্র আত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে চেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠিত কোনো পাত্র। ছেলেটির বিদেশ যাওয়ার সুযোগ আসে। যাওয়ার আগে এক বন্ধুর বাড়িতে কাজি ডেকে বিয়ে করে তারা। ছেলেটি প্রতিষ্ঠিত হলে, তবে বাড়িতে জানিয়ে বউ করে ঘরে নেবে এমন প্রতিশ্রুতিতে তারা পরস্পরের হয়ে যায়। ছেলেটি বিদেশে যায়। মেয়েটির বিয়ের প্রস্তাব আসে বেশ কয়েকটি। কিন্তু নানা অজুহাতে সেগুলো ফিরিয়ে দেয় সে। মৃত্যু হয় বাবার। বাবা মারা যাওয়ার পর বড় ভাই এবার বোনকে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে। মেয়েটি বাধ্য হয়ে সব খুলে বলে। এবার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসী ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছেলেটি সব অস্বীকার করে। বলে বিয়ে হয়নি। একজন বন্ধু নাকি কাজি সেজেছিল। যা হোক, এবার মেয়েটির বিয়ের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তত দিনে ২৭ পেরিয়ে যাওয়া, সাদামাটা চেহারার এবং মধ্যবিত্ত ঘরের বাপমরা মেয়েটির আর বিয়ে হয়নি। বিশেষ করে তার নকল বিয়ের ঘটনাটি এমন বদনাম ছড়ায় যে আর পাত্র পাওয়া যায় না। এখন মেয়েটি ভাইয়ের বাড়িতে বিনে মাইনের রাঁধুনি। ছেলেটি সুখে আছে বিদেশি স্ত্রী নিয়ে।

পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেই মেলে হরেক রকম খবর। প্রেমিক ও তার বন্ধুদের দ্বারা গণধর্ষণের শিকার প্রেমিকা, আবার প্রেমিকার মোবাইল কলে সাড়া দিয়ে অপহরণ ও খুন হওয়া তরুণ, প্রেমিক জুটির আত্মহত্যা সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে অহরহ। সত্যিকারের ভালোবাসা কী তবে এখন নেই? থাকবে না কেন। আজও আছে। বাঁশি আজও বাজে। বাজে নূপুরও। তবে হাজার হাজার মিথ্যা বাঁশির আওয়াজের মধ্যে সঠিক সুরটি চিনে নেওয়া বেশ মুশকিল। তেমনি মুশকিল শত নূপুরের ধ্বনি থেকে সঠিক তালের ধ্বনি চিনে নেওয়া। ভুল মানুষকে ভালোবেসে জীবন ধ্বংস করে ফেলা অনেক কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। অনেকের কথা শুনেছি। অনেকের ঘটনা পড়েছি পত্রিকায়। বেশির ভাগ সময়ই ভুল করে ভুল জলে নেমে পড়া মানুষের আর ফেরার পথ থাকে না। আর এখন ভার্চুয়াল প্রেমের জগতে অ্যাকচুয়াল প্রেম খুঁজে পাওয়া, চিনে নেওয়া সবটাই কঠিন। কোন প্রেম সঠিক আর কোনটা ভুল কে বলে দেবে? গুরুদেবের ভাষায়, ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটাকে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’ তবে সময়ের কষ্টিপাথরেই প্রমাণ হয়ে যায় ভালোবাসার আসল-নকল। যে প্রেম গড়তে দুদিন, ভাঙতে একদিন সেগুলো আদপে প্রেমই নয়। আর যে প্রেম জীবন-মরণের সীমানা ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় একক উচ্চতায় সেটিই প্রকৃত প্রেম। সেটাই মানবজীবনের বড় সত্য। আর সেই উচ্চ শৃঙ্গের আশপাশেই আছে অতল খাদ। সে খাদ মিথ্যার, সে প্রেম ভ্রান্তির, সে প্রেম স্বার্থের। সে ভালোবাসার সুন্দর মুখোশ পরে থাকে বটে, কিন্তু মুখোশ সরালে দেখা যায় তার ভয়ংকর রূপ।

কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ সেটাও বলে দেয় সময়। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষকে তাই বলতে চাই—সম্পর্কে জড়ানোর আগে একটু ভাবনা, একটু সতর্কতা দরকার। ভীষণ দরকার। ভালোবেসে ঝাঁপ দিন চোখ বন্ধ করে তাতে আপত্তি জানাচ্ছি না। কিন্তু ঝাঁপ দেওয়ার আগে চোখটা খুলে একটু দেখে নিন কোথায় ঝাঁপ দিচ্ছেন। ভালোবাসা বিষয়ে আমার একান্ত ব্যক্তিগত মত হলো, ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম’ কিংবা ‘গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি’ হলেই যেন ভালোবাসা গভীর হয়। এ তো অন্তঃশীলা নদী। প্রকাশ্যে কূল ছাপিয়ে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেলেই তাতে পলি পড়ে বেশি করে। ‘প্রকাশ্যে চুমু’, ‘প্রকাশ্যে প্রপোজ’ আমি এগুলোর সমর্থক নই। নিভৃতে থাকলেই ভালোবাসার সৌন্দর্য আমার কাছে বেশি বলে মনে হয়। তবে ভিন্নমত থাকতেই পারে। বিশ্বে ঘৃণা, যুদ্ধ, হানাহানির তো শেষ নেই। বছরে একটি দিন না হয় রইলই ভালোবাসার জন্য। তবে একটি দিন মাত্র নয়। সব সময়ই প্রিয়জনের জন্য কেয়ারিং হওয়া, সামগ্রিকভাবে মানুষকে ভালোবাসা, প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং আমাদের এই সুন্দর বিশ্বকে ভালোবাসা—এক জীবনে এর চেয়ে বেশি কিছুর প্রয়োজন আছে কি?

লেখক : সাংবাদিক, কবি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

20 + eight =